Wed. Mar 3rd, 2021

টাঙ্গুয়ার হাওর মাছের আবাস্থলে পলি জমে নষ্টের দ্বারপ্রান্তেঃখননে নেই কোনো উদ্যোগ

তাহিরপুর প্রতিনিধি : দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর মা মাছের আবাস্থল ঢলে আসা বালি ও পলি জমে নষ্টের দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

জানা যায়, বিশাল এই জলরাশির উল্লেখযোগ্য চিতল,কালিবাউশ ও কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র আলমের দোয়ার। যেখানে পূর্বে প্রতিবছর প্রায় কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হত। বর্তমানে মাছের এই প্রজনন ক্ষেত্রটি মাছ শুন্যের পথে।যার ফলে হাওরে মাছের প্রজনন দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে এবং বিলুপ্তি ঘটছে মিঠা পানির মাছের অনেক প্রজাতির।যে গুলো এই হাওরে প্রকৃতিক ভাবেই প্রজনন হত।এছাড়াও টাঙ্গুয়ার হাওরের এরাইল্যাকুনা,সমসার বিল,বাগমারা গুপ, টানেরগুল,রাঙামাটিয়া বিল সহ কয়েকটি বিলে পানিতে পূর্ণ থাকত এক সময় এবং মিটা পানির মাছ ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল। এই হাওরের বিভিন্ন প্রজাতির বড়বড় মাছ আকৃষ্ট করত দর্শনার্থীদের।

টাঙ্গুয়ার হাওরের সেই রুপ এখন আর নেই,কালের বিবর্তনে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বালি পড়ে ও বাঁধ ভেঙে পলি জমে ভরাট হতে হতে এখন শুকনো মাঠের আকার ধারণ করে হাওরের বেশ কিছু বিল।

স্থানীয়রা জানান, বিলুপ্তি পথে থাকা মাছগুলোর অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে ও মাছের প্রজনন বৃদ্ধি করতে,হাওরে মাছের আবাস্থল গুলো পরিকল্পিত ভাবে খাননসহ আবাস্থল গুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ কাটা বাঁশ স্থাপন সহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

বিশ্বের বিস্ময় মা মাছের অভয়ারণ্য টাঙ্গুয়ার হাওর,সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার ১৮টি মৌজার প্রায় ৫১টি ছোট-বড় বিলের সমন্বয়ে ১০০বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঘন নীল জলরাশি নিয়ে শুয়ে আছে বিস্তীর্ণ এই জলরাশি।

তথ্যসুত্রে জানা যায়,জীববৈচিত্র্যে ভরপুর টাঙ্গুয়ার হাওরে একসময় প্রায় ১৪০প্রজাতির মাছ,এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রুই,কালিবাউশ,

চিতল,আইড়,বোয়াল,মাগুর,বাইম,গজার,সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ,তবে রুই ও কালিবাউশ মাছের স্বাদ অতুলনীয়।

স্থানীয়দের তথ্যমতে জানাযায় তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান এ হাওরে সরাসরি মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ছড়া (ঝরনা) এসে মিশেছে এসব ছড়া(ঝড়না)দিয়ে প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বালি এসে হাওরের মাছের আবাস্থল সহ বিভিন্ন স্থানে জমা হয়ে,মাছের আবাস্থল গুলো ধীরেধীরে নষ্টের দারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে।অন্যদিকে হাওরে ঘুরতে আসা পর্যটকরা পলিথিনসহ নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা অবাধে ফেলেন হাওরের পানিতে।এতে দিনদিন দূষণের শিকার হচ্ছে হাওরের পানি।এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে হাওরের মাছ,গাছ, পাখিসহ প্রাণবৈচিত্রের ওপর।জানাযায় এ হাওর হতে রিটা,মহাশোল,নানিদ,সরপুঁটি,বাঘাইড়,বিলুপ্ত ঘটেছে ।এছাড়াও ঘাউড়া, বাঁচা,চিতল,কাতলা,মৃগেল,সহ বেশ কিছু প্রজাতির মাছ তেমনটা চোখে পড়ছে না।

স্থানীয় মুরব্বি কপিলনুর মিয়া বলেন, মা মাছের অভয়ারণ্য টাঙ্গুয়ার হাওরের উল্লেখযোগ্য চিতল কালিবাউশ ও বাঘআইড় মাছের আবাস্থল আলমের দোয়ার,কালের বিবর্তনে পাহাড়ি ঢলে বালি পড়ে পলি জমে নষ্টের দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছের কথা বল্লে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম অবাক হয়ে কাল্পনিক গল্প মনে করবে।২০-২৫ বছর পূর্বের বল্লে বড়বর রুই,কাতলা,ও বোয়ালের প্রতিটির ওজন ছিল ১৫-২০ কেজি। সে সময় যে মাছগুলো পাওয়া যেত সেগুলো এখন চোখেও পড়ে না। আমাদের চোখের সামনে মাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন পন্থায় মাছ শিকার হচ্ছে। কোনটিরই নিয়ন্ত্রণ নেই। এভাবে থাকলে মনে হচ্ছে এক সময় শুধুই পানি আর পোকা থাকবে,মাছ পাওয়া যাবে না।

এ ব্যাপারে টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহাম্মদ কবির বলেন, ছোট সময় আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরে অনেক মাছ দেখেছি, বড় বড় রুই,বোয়াল,চিতল,সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। কিন্তু কালের বিবর্তনে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বালি পড়ে পলি জমে নষ্টের দিকে দাপিত হচ্ছে, এগুলো পপরিকল্পিত ভাবে খনন না করলে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ কাটা বাঁশ স্থাপন না করলে ভবিষ্যতে হাওরটি মাছ শূণ্য হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সুশীল সমাজ প্রতিনিধি সমীরণ তালুকদার বলেন, উজান থেকে পাহাড়ী ঢলের সাথে নেমে আসা বালি, কান্দাগুলো উজাড় হওয়া এবং বিল শুকিয়ে মাছ ধরার সহ বিভিন্ন কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্তর্গত প্রত্যেকটি বিলের গভীরতা কমে গেছে, তাই এগুলো দ্রুত এবং পরিকল্পিত উপায়ে এখনই খনন করা না হলে হাওরের জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে। তাই প্রতিটি বিল যত দ্রুত সম্ভব এগুলো খনন করার দাবি জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পিযুস পুরকায়স্থ টিটু বলেন প্রতি বছরেই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বালি পড়ে পলি জমে টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছের আবাস্থল নষ্টের দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে,মাছের আবাস্থল গুলো পরিকল্পিত উপায়ে, পরিবেশ ও জৈববৈচিত্রকে বাঁচিয়ে খনন করতে হবে।