Wed. Jan 20th, 2021

সুপ্রিম কোর্টে নেই ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার: বারান্দায় স্তন্যপান করালেন মা

ডেইলি বিডি নিউজঃ মামলা ফাইলিং করা থেকে শুনানি ও লিখিত আদেশ হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে দিনভর চলে সুপ্রিম কোর্টের কর্মব্যস্ততা। দেশের সর্বোচ্চ এই আদালতে দূর-দূরান্ত থেকে বিচারপ্রার্থীরা তাদের মামলার শুনানি করতে ছুটে আসেন। তাদের মতই একজন রাহেলা বেগম (ছদ্মনাম)। মামলার প্রয়োজনে দুধের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। এরপর শিশুর কান্নার জেরে সঙ্গে থাকা ফুফাতো বোনকে আড়াল বানিয়ে কোর্টের চলাচলের পথেই নিজ সন্তানকে বুকের দুধ পান করালেন তিনি।

ঢাকার বাইরের একটি জেলা থেকে মামলার প্রয়োজনে গতকাল বুধবার (২ ডিসেম্বর) হাইকোর্টে এসেছিলেন নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক শিশুটির মা। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ভবনের বারান্দায় এসময় মামলার কাজে ছোটাছুটি করছিলেন আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, ক্লার্কসহ অসংখ্য মানুষ। তখনই ভবনের একটি দেওয়ালের পাশ ঘেঁষে সংকুচিত হয়ে মুখ লুকিয়ে থাকতে দেখা যায় এক নারীকে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আরেক নারী বারবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলেন। এরপর লক্ষ্য করে দেখা যায় বসে থাকা নারীটি দাঁড়িয়ে থাকা নারীর আড়ালে নিজ শিশুকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন। মুহূর্তেই ছবিটি নিজ মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রোকসানা শিরিন।

কিছুক্ষণ পর ওই মা কাজের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করেন। এসময় কথা বলতে চাইলে অপরাগতা জানান। ওখানে বসে শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তারা একরকম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং ক্ষমা চাওয়ার আকুতি-মিনতি জানাতে থাকেন। দীর্ঘসময় তাদের বুঝিয়ে বলার পর নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান শিশুটির মা।

তিনি বলেন, ‘বাচ্চাটারে আনতে চাই নাই। কিন্তু কতক্ষণে কাজ শেষ হবে তা বুঝতে পারি নাই। কোর্টের আসার পর খুব কাঁনতেছিলো (কাঁদছিলো)। অনেক ক্ষুধা লাগছিলো বাচ্চাটার। কোনও জায়গা না পাওয়া এখানে বসেই বাচ্চাটাকে খাওয়ালাম (বুকের দুধ)। ওর খালাকে বললাম একটু পাশের দিকে আড়াল দিয়ে দাঁড়াতে। যেন কেউ দেখতে না পারে।’

সুপ্রিম কোর্টে যদি শিশুদের বুকের দুধ পান করানোর জন্য রুম থাকতো তাহলে কেমন হতো জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, ‘একটা রুম থাকলে তো ভালোই হইতো। অনেকক্ষণ বাচ্চাটারে খাইতে দেই নাই। কাজ শেষ হবে শেষ হবে কইরাও শেষ হইলোনা। তাই… ’

এ বিষয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, হাইকোর্ট রুল ও একটি নির্দেশনা অনুসারে দেশের সমস্ত পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, শ্রম ট্রাইব্যুনাল, লঞ্চ টার্মিনাল, চট্টগ্রামের রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এতে করে সরকার আদালতের রুল শুনানি চলমান থাকাকালে এবং একটি নির্দেশনা মেনে নিয়েই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করেছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্থাৎ এ মামলার রুল, আদেশ ও নির্দেশনা ইতিমধ্যে সরকার মেনে নিয়েছে। তাই সঙ্গত কারণেই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের উচিত ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর নিরাপদ পরিবেশে ও স্বাচ্ছন্দ্যে মায়ের বুকের দুধ পান করতে ৯ মাসের শিশু উমাইর বিন সাদির পক্ষে তার মা ইশরাত হাসান হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশের সকল কর্মক্ষেত্র, এয়ারপোর্ট, বাস স্টেশন, রেলওয়ে স্টেশনে, শপিং মলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এছাড়াও পাবলিক প্লেস ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে নীতিমালা তৈরি করতে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চান আদালত।

এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি গার্মেন্টসসহ দেশের সকল কারখানায় পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবি কেয়ার কর্নার স্থাপনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি আদালতের আদেশ প্রতিপালন করে ৬০ দিনের মধ্যে শ্রম মন্ত্রণালয় সচিব ও শ্রম অধিদফতরের চেয়ারম্যানকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত। রিট আবেদনটির শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতের ওই আদেশের পর দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপিত হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে এ জাতীয় কোনও কর্নার না থাকার কারণে সন্তানকে স্বাচ্ছন্দ্যে বুকের খাওয়াতে লুকোচুরি করতে হয় নারী আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের।