|
এই সংবাদটি পড়েছেন 2,512 জন

আজ সেই ভয়াল ২৫ ফেব্রুয়ারি

নাঈম চৌধুরীঃ ২০০৯ সালের এই দিনের নৃশংসতা জাতির জন্য কলঙ্কিত এক ইতিহাস। মাত্র দু’দিনের নারকীয় নৃশংসতায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ একসঙ্গে ৭৫ জনকে হত্যাযজ্ঞের বীভৎস ইতিহাস নজিরবিহীন।

২০০৯ সালের এই দিনে শতাধিক সেনা পরিবার বিডিআরের কিছু বিপথগামী সদস্যের পৈশাচিকতায় ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে যায়। শতাধিক শিশু হারায় বাবা-মা। অনেক নারী হন স্বামীহারা। খালি হয় অনেক বাবা-মার বুক। আকাশে বাতাসে অনুরণিত হয় সন্তান হারানোর বেদনা।

একটি সুশৃংখল বাহিনীতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোচনার ঝড় তোলে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এমন নারকীয় ঘটনা আইন-শৃংখলা রাকারী বাহিনী, সরকার, জনগণ সবাইকেই হতচকিত করে তোলে।

একজন মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার কর্নেল, লে. কর্নেল, মেজরসহ ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার লোমহর্ষক সেই কাহিনী আজও অনেককে কাঁদায়। আজও বিদ্রোহের সেই দুঃসহ স্মৃতি জীবন্ত হয়ে ভাসে।

পিলখানাকে ঘিরে দুই বছর আগের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি দু’দিন দু’রাত কাটানোর সেই বিরল দুঃসহ স্মৃতিও আজও তাড়া করে ফেরে। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি আর গ্রেনেডের শব্দ আজও যেন কানে লেগে আছে। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তেেপ অনিবার্য সংঘাত থেকে রা পায় দেশ ও জাতি।

দেশের প্রচলিত আইন-কানুন দ্বারাই পরিচালিত হ”েছ বিডিআরে সংঘটিত মামলা-মোকদ্দমা। তবে বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে বিডিআর আইনে। তবে খোয়া যাওয়া অনেক অস্ত্রের খোঁজ মেলেনি আজও।

প্রায় ৩৬ ঘণ্টার বিদ্রোহের পর পিলখানা পরিণত হয় একটি মৃত্যুপুরীতে। শুধু লাশ আর রক্ত। পোড়া গাড়ি, ভাঙা গ্লাস, ঘাষের ভেতর তাজা গ্রেনেড আর চারদিকে ধ্বংসের চিহ্ন। সেনা কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারগুলোর তছনছ। বিভিন্ন স্থাপনায় জ্বালাও-পোড়াওয়ের চিহ্ন।

ড্রেন আর ম্যানহোল থেকে ভেসে আসা রক্তের উৎকট গন্ধ। প্রথম দফায় কামরাঙ্গীরচরে একটি সুয়ারেজ লাইন থেকে কয়েক দফায় ৯ জন সেনা কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হাসপাতালের পেছনে একটি গণকবর থেকে উদ্ধার হয় একসঙ্গে ৩৯টি লাশ। এমটি গ্যারেজ মাঠের পাশ থেকে আরও একটি গণকবর থেকে উদ্ধার হয় ৯টি লাশ।

এ বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক ও দু’জন সেনা কর্মকতার স্ত্রীসহ মোট ৬১ জন নিহত হন। এছাড়া পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান সাত বিডিআর সদস্য।

বিডিআর সদর দফতরের বিভিন্ন গেট থেকে ফাঁকা গুলি করায় আশপাশের আরও সাতজন পথচারী নিহত হন। এ ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫-এ।

আজ ভয়াল ২৫ ফেব্রুয়ারী

আজ ভয়াল ২৫ ফেব্রুয়ারী

ভয়ঙ্কর ৩৬ ঘণ্টা- বিডিআর সপ্তাহ। পিলখানার সবুজ বিশাল চত্বর সাজানো হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন করে। এই দিনটির জন্য মাসখানেক ধরে সেনা কর্মকর্তাদের কমান্ডে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কঠোর অনুশীলন করেছে বিডিআর সদস্যরা। কিন্তু গভীরে যে কী ভয়াল ষড়যন্ত্রের ছক আঁকা হয়েছিল, তা কেউ ভাবতেই পারেননি।

ঠিক একদিন আগেই পিলখানার বিডিআর সদর দপ্তরে তিন দিনব্যাপী রাইফেলস সপ্তাহের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজনের দ্বিতীয় দিন। শেষ হওয়ার কথা কথা ছিল ডিনার আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু তার আগেই ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটে যায় মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ।

সকাল ৯টায় যথারীতি দরবার হলে বসেছিল বার্ষিক দরবার। সারাদেশ থেকে আসা বিডিআর জওয়ান, জেসিও, এনসিওসহ বিপুলসংখ্যক সদস্যে তখন পরিপূর্ণ দরবার হল। মঞ্চে বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমদসহ বিডিআরের উর্ধতন কর্মকর্তারা।

আনন্দমুখর এক পরিবেশ। কিন্তু সে আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। বিপথগামী একদল বিডিআর জওয়ান বিদ্রোহের নামে মেতে ওঠে মধ্যযুগীয় কায়দায় নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে। বিদ্রোহীরা পাখির মতো ব্রাশফায়ার করে সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করতে শুরু করে।

নির্বিচারে অত্যাধুনিক অস্ত্রের গুলিতে প্রাণ হারান বেসামরিক ও সাধারণ মানুষও। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এমনকি ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ঘটনাও ঘটেছিল সেদিন। এখানেই শেষ নয়, নরপিশাচরা নিহত সেনা কর্মকর্তাদের লাশ গুম করতে গণকবর দিয়েছিল, ফেলেছিল ম্যানহোলে। রক্তের বন্যায় ভেসে যায় দরবারহলসহ পুরো পিলখানার সবুজ চত্বর।

অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঘাতক দল পিলখানার অভ্যন্তরে বিডিআর মহাপরিচালকের বাসায় ঢুকে তাঁর স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর বাসায় বেড়াতে আসা স্বজনদেরও হত্যা করা হয়।

পিলখানার অভ্যনত্মরে যখন নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চলে, ঠিক তখন আরেক ঘাতকদল সদর দপ্তরের সকল প্রবেশপথ, উঁচু ভবনে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় এবং নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। পরিকল্পিতভাবে একাত্তরের কায়দায় পুরো পিলখানাকেই বধ্যভূমিতে পরিণত করে ঘাতকরা।

বিদ্রোহের পেছনের কারণ– বিদ্রোহের সূত্রপাতের পর শোনা গিয়েছিল বিডিআর জওয়ানদের নানা অসন্তোষ আর ক্ষোভের কথা। এমনও শোনা গিয়েছিল যে, `অপারেশন ডাল-ভাত` কর্মসূচীতে পরিচালিত ন্যায্য মূল্যের দোকানগুলোতেও যে সৈনিকরা দায়িত্ব পালন করত, তারা লভ্যাংশ না পেয়ে, বাড়তি শ্রমের মূল্য না পেয়ে ুব্ধ ছিল ডিজির ওপর।

আর বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার কারণেই নাকি এ ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল ২৫ ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, নিহত সেনা কর্মকর্তাদের উদ্ধারকৃত বিকৃত লাশ ও হত্যার ধরন দেখে বুঝতে কারও বাকি থাকেনি এটা নিছক বিদ্রোহ নয়, সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যার পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।

প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী অবস্থান- বিডিআর বিদ্রোহের পর ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশকে অনিবার্য গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েও স্থিরচিত্তে প্রজ্ঞা, সাহসিকতা ও সিদ্ধান্ত দিয়ে নেপথ্যের কুশীলবদের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন।

নানা গুজব, আশঙ্কা ও চাপের মুখেও ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও সাহসের চরম পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে।

ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত খুনী বিডিআর সদস্যদের দমনে সেনা অভিযান ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এটা নিশ্চিত হয়েই সরকার রাজনৈতিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়। অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞা নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তখন সকল সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিদ্রোহ দমনে আলোচনা চালিয়ে যান, দলীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণে চেষ্টা চালিয়ে যান।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে বারবার বৈঠক করেছেন, কথা বলেছেন। পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে রাজনৈতিক সরকার ও সামরিক নেতৃত্ব একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এতে পরিস্থিতি মোকাবেলা ও সঙ্কট-উত্তরণ সহজ হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী উচ্ছৃঙ্খল বিডিআর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, তার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ একাধিক মন্ত্রী-এমপি দফায় দফায় বৈঠক করে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

এরপরও কাজ না হলে ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বিডিআর বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বলেন- `আপনারা অস্ত্র সংবরণ করে ব্যারাকে ফিরে যান। অন্যথায় আমি দেশবাসীর স্বার্থে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো। আমাকে বাধ্য করবেন না।`

প্রধানমন্ত্রীর এ কঠোর বক্তব্যে বিডিআরের উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। পরে সেনা অভিযানে নয়, রাজনৈতিক পদক্ষেপেই বিডিআর সদস্যরা অস্ত্র-সমর্পণ করে, পরবর্তীতে বিনা রক্তপাতেই বিডিআর দমন করে সরকার।