Fri. Jan 22nd, 2021

করোনাকালে রাহাত তরফদার গং এর মানবিক কর্মকান্ড

ফারহানা বেগম হেনাঃ পৃথিবীর এখন ভয়ানক দুঃসময়, দুঃসময় এখন দেশেরও। জীবাণুর বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো যখন মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখন আমাদের দেশ নিয়ে শঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই পর্বতসম। একদিকে যেমন ব্যাপক ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র, তেমনি তার স্বাস্থ্য সুবিধা ও স্বাস্থ্য সচেতনা দুই-ই নাজুক। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অদক্ষতাও সুবিদিত। আর রাজনীতি নিয়ে নাগরিক অসন্তোষের একটি বড় উপলক্ষ ছাত্রলীগ। আওয়ামীলীগের অংগ সংগঠন সমূহের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সমালোচিত ছাত্রলীগ৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব সমালোচনা সঙ্গতও। কিন্তু করোনাকালে সিলেটে আমরা দেখতে পেলাম এক মানবিক সাবেক ছাত্রনেতা ও তার দলবলের।

তিনশো ষাট আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটে চিকিৎসক, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী, পুলিশ বাহিনী, স্বেচ্ছসেবকবৃন্দ যে যার মতো করেই জীবন বাজি রেখে জীবাণুর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। সবার অবদানই শ্রদ্ধার দাবি রাখে। তবে আলাদাভাবে নজর কেড়েছে সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাহাত তরফদার ও তার কয়েকজন কর্মীর মানবিক কর্মকান্ড। সবাই একসময় গৃহমুখী হয় বা হতে হয়, কিন্তু তারা ছিলো রাস্তায়।

তারা রাস্তায় থেকেছে প্রিয়জনের ছলছল চোখের অপেক্ষা উপেক্ষা করেই। তারা রাস্তায় থেকেছে নিজেদের বা পরিবারের নিরাপত্তা ভাবনা উপেক্ষা করেই। রাস্তায় হাজার হাজার, লাখ কিংবা কোটি মানুষের স্রোত- যার মধ্যে যে কেউ বইতে পারে এই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিত্যকায় সম্মুখে থাকা সাধারণ কথা নয়। এত সীমাবদ্ধতা তারপরও তারা যেভাবে অবিচল থেকেছে, তাতে আমরা এই অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে ভরসা পেয়েছি।

তাদের শুরু ছিলো শহীদ নূর হোসেন সাইবার ব্লকের উদ্যোগে ও সহায়তায় জনসচেতনতা সৃষ্টি, নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পন্য ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণের মতো মানবিক কার্যক্রম দিয়ে। পরবর্তী সময়ে তারা পালন করেছে আরো অগ্রণী ভূমিকা৷ সরকার যখন অতি প্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগ রক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি মানানোর এবং অযথা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য সাধারন ছুটি ঘোষনা করলো তখন সিলেটের নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে শুরু হয়েছে খাদ্য সংকট৷ আর মধ্যবিত্তদের সহ্য ক্ষমতা অনেক, তারা না খেয়ে জীবন ত্যাগ করতে রাজী কিন্তু লোকদেখানো ত্রানের নামে ফটোসেশনে নিজের পরিচয় প্রকাশে রাজী নয়।

আর তাই সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাহাত তরফদার, তার ভ্রাতুষ্পুত্র, বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিনহাজুল আবেদীন নাঈম চৌধুরী, প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ চঞ্চল চৌধুরীর ভাগিনা সিলেট মহানগর ছাত্রলীগ নেতা রাবীব মুহতাদী চৌধুরী, মিনহাজ সামীর, মিজান ইসলাম, শিবিরের হামলায় আহত ছাত্রলীগ কর্মী আসিফ-শাহীন ও জোহান চাকমা সমন্বয়ে গঠিত মানবিক দল এগিয়ে এলো সিলেটের মধ্যবিত্ত পরিবার সমূহের সহায়তায়৷ নিজস্ব তহবিল, আর রাহাত তরফদাদের ফেইসবুক পোস্টের সহায়তায় সংগ্রহ করা হলো বেশ কিছু অর্থ৷ ততক্ষণে সিলেট তথা সারাদেশে গণসংক্রমণ শুরু হয়েছে। কিন্তু পিছুপা হয় নি, “দেশের তরে আমরা” নামধারী কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাকর্মী৷ ফেইসবুকের পোস্টে যোগাযোগের নাম্বার দেয়া হলো, বলা হলো খাদ্য সংকটে থাকা যেকোন কেউ খাদ্য সহায়তা চাইতে পারেন এবং তার নাম পরিচয় গোপন রাখার ও প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো। কল আসতে শুরু করলো রাহাত তরফদার এর মোবাইলে আর গাড়ি বোঝাই করে খাদ্য সহায়তা নিয়ে গ্রামে বা শহরে সহায়তাকামীদের কাছে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিতে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৎপরতা শুরু করলো মিনহাজুল আবেদীন নাঈম এর নেতৃত্বে রাবীব, মিনহাজ সামীর, মিজান, শাহীন, আসিফ আর জোহান৷

তারা কোথায় না গিয়েছে, কী না করেছে? মানবিক বিপর্যয় যখন তুঙ্গে তখন কাঁধে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গেছে৷ অসহায় মানুষকে গৃহে পৌঁছে দিয়েছে। ক্ষুধার্তকে রাতের আঁধারে খাবার পৌঁছে দিয়েছে।

এমন অবস্থায় দেশে এলো রমজান৷ এমনিতেই অসাধু ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো থাকে। তার ওপরে করোনা যোগ করেছে নতুনমাত্রা। খাদ্যসামগ্রীর আকাশ্চুম্বি দামে মানুষের রোজা রাখাও তখন দায়৷ আবারো তারা মাঠে নামলো, ফেইসবুকে পোস্ট দিলেন রাহাত তরফদার, সাড়া পড়লো সবার মাঝে, দেশ বিদেশের অনেকেই এগিয়ে আসলেন সহায়তা নিয়ে৷ সিলেট শহরের চালিবন্দরে অবস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এডভোকেট আক্তার উদ্দীন আহমদের বাসা কাঞ্চন ভিলায় ঘাটি গেড়ে তৈরী করতে লাগলো রোজাদারদের জন্য খাদ্য সহায়তা সামগ্রীর ব্যাগ৷ আর রাহাত তরফদার এর ফোনে কল আসামাত্র গাড়ি বোঝাই খাদ্য সহায়তা নিয়ে গ্রামেগঞ্জে শহরে বন্দরে ছুটে গেলো মিনহাজুল আবেদীন নাঈম চৌধুরী, রাবীব মুহতাদী চৌধুরী, মিনহাজ সামীর, মিজান ইসলাম, শাহীন, আসিফ, জোহান প্রমুখ৷ খাদ্য সহায়তা নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ছুটতে গিয়ে করোনাক্রান্ত হয়েছেন তারা কিন্তু তাদের মানবিক কর্মকান্ড সরকার ঘোষিত সাধারন ছুটির শেষ দিন অব্দি চালু ছিলো৷ অবিচল এই সম্মুখযোদ্ধারা লড়াইয়ে বিন্দু মাত্র ক্ষান্ত হয়নি। তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি আমাদেরও আছে দায়িত্ব। আমাদের অসচেতনতা ও হঠকারিতার বলি যেন না হয় দিনরাত লড়তে থাকা এই ভাইয়েরা। স্যালুট আপনাদের।

গভীর রাতে অথবা ইফতারের আগ মুহুর্তে যখনি কল এসেছে ছুটে গিয়েছে তারা খাদ্য সহায়তা নিয়ে৷ এরকম বহু চিত্রের সাক্ষী হয়েছি আমরা। বেশিরভাগই চোখের সামনে আসেনি। এ রকম নিরলস ও আন্তরিকতার বহু উদাহরণ ইতিহাস হয়ে থাকবে। সবাই যদি রাহাত তরফদার ও কর্মীদের মত সচেতন হতো তাহলে হয়তো প্রশাসনের ঘাড়ে এসব বাড়তি দায়িত্ব কম আসত। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। আমাদের নির্বুদ্ধিতা, নির্লিপ্ততা এবং বহুক্ষেত্রে হঠকারিতা আমাদের সম্মুখযোদ্ধাদের কাজের পাশাপাশি ঝুঁকি ও বিপদ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাদের নানান সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুলতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিলো কিন্তু জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে রাহাত তরফদার, মিনহাজুল আবেদীন নাঈম চৌধুরী, রাবীব মুহতাদী চৌধুরী, মিনহাজ সামীর, মিজান ইসলাম, শাহীন ও জোহান যেভাবে জীবনের পরোয়া না করে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, দেশের ইতিহাসে তা সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এই সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর কর্মকান্ড নতুন করে আশা জুগিয়েছে। এই সম্মুখযোদ্ধাদের জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনে আরও বলিষ্ঠ ও ইতিবাচক ভূমিকায় দেখতে চায়৷

এই ক্রান্তিকাল হয়তো শেষ হবে কোনো একদিন। সবাই ফিরে যাবে চেনা জীবনে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, আতঙ্ক আর বিয়োগের এই করোনাকাল দুঃসহ সব স্মৃতির সাক্ষী হয়ে থাকবে। তার মধ্যেও গর্ব করার মতো স্মৃতি হয়ে থাকবে আমাদের সম্মুখ যোদ্ধা রাহাত তরফদার, মিনহাজুল আবেদীন নাঈম চৌধুরী, রাবীব মুহতাদী চৌধুরী, মিনহাজ সামীর, শাহীন, আসিফ আর জোহানের ত্যাগ, শ্রম ও দেশশ্রেম। আরও অনেকের ত্যাগ পরিশ্রম নিয়ে সুযোগ হলে লিখব অন্য কোনো সময়।