Sun. Apr 11th, 2021

ওসমানীতে বেপরোয়া ওয়ার্ড মাস্টার রওশন

ডেইলি বিডি নিউজঃ সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ‘গুরুতর’ কোনো অভিযোগ নেই। বরং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে প্রতিদিন বেশিসংখ্যক রোগীকে সেবা দিয়ে থাকেন। এ কারণে প্রশংসিত হচ্ছে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ এ প্রতিষ্ঠানটি। তবু নানা কারণে বারবার বিতর্কিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতালে রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের লাগামহীন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা। তারা রোগীকে পণ্য বানিয়ে হয়রানির পর হয়রানি করে। এ কারণে চিকিৎসাসেবা নিয়ে কেউ হাসিমুখে বের হন না। আচার-ব্যবহার ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেকেই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ওসমানী হাসপাতালমুখী হন না।

হাসপাতালের কর্মচারীদের ‘নিয়ন্ত্রক’ হচ্ছেন ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিব। কর্মচারীদের পদ বণ্টন, ওয়ার্ডের দায়িত্বসহ অনেক বিষয় দেখভাল করেন তিনি। কিন্তু তার বেপরোয়া কর্মকাণ্ড ও টাকা লুটের মহোৎসবের কারণেই হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহল জানলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিব প্রায় এক যুগ ধরে ওসমানীতে কর্মরত রয়েছেন। এই এক যুগের শাসনে তিনি ওসমানী হাসপাতালকে টাকা আয়ের খনি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এছাড়া কর্মরত নারীদের কু-প্রস্তাবসহ নানা কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ৯ই ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছেন রুপা খানম নামের আউটসোর্সের এক নারী কর্মচারী। সম্ভ্রম হারানোর আশঙ্কায় থানায় জিডিও করেছেন। আর এই জিডি দায়েরের পর রওশনকে ঘিরে তোলপাড় চলছে হাসপাতালে। নানা কথা রটছে কর্মচারীদের মুখে মুখে। রওশন হাবিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিস্তর। এসব অভিযোগের মধ্য রয়েছে- ক্যাজুয়েলিটি বিভাগসহ দু’টি ওটির ওষুধসহ সরঞ্জাম বিক্রি,জরুরি বিভাগের ট্রলি বাণিজ্য,লেবারওয়ার্ডে নিজের বলয়ের মাসি নিয়োগ ও ওষুধ বাণিজ্য,টাকার বিনিময়ে ওটিতে কর্মচারী বদলি, প্রতি ওয়ার্ড থেকে প্রতি রোস্টারে নির্ধারিত টাকা আদায়, হাসপাতালের কোয়ার্টার ব্যবহার না করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ধোপা কোয়ার্টারে বসবাস, মহিলা কর্মচারীদের হয়রানি ও আউটসোর্সিং কোম্পানিতে কর্মচারী নিয়োগে টাকা আদায়। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের কারণেই ওসমানী হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে।

হাসপাতালের কয়েকজন পুরনো কর্মচারী জানিয়েছেন, ওসমানী হাসপাতালের মহিলা কর্মচারীরা সব সময় তার কারণেই তটস্থ থাকেন। কখন তার নজর কার ওপর পড়ে সেটি কেউ জানেন না। যখন যার ওপর নজর পড়ে তখন তাকে ডেকে নেয়। এতে অনেকেই চাকরি হারানো ও মান-সম্মানের ভয়ে প্রতিবাদ করেন না। ২০১১ সালের দিকে তেমনটিই ঘটেছিল হাসপাতালে। ওই সময় ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিব এক মহিলাকে নিয়ে স্টাফ কেবিনের ভেতরেই ছিলেন। খবরটি যায় তার স্ত্রীর কাছে। তার স্ত্রীও ছিলেন ওই হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স। তিনি এসে রওশন হাবিবের কুকীর্তি ধরে ফেলেন। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে অনেক ঝামেলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে ঘটনাটি। এই ঘটনার পর স্ত্রী রওশন হাবিবকে ডিভোর্স দেন। এখন একমাত্র মেয়েকে নিয়ে রওশন ওসমানী মেডিকেলে ধোপা কোয়ার্টারে বসবাস করেন। কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ধোপা কোয়ার্টারে রওশন হাবিব অবৈধভাবে বসবাস করছেন। তার বসবাস করার কথা স্টাফ কোয়ার্টারে। কিন্তু নিজের প্রয়োজনেই তিনি স্টাফ কোয়ার্টারে বসবাস না করে ধোপা কোয়ার্টারেই থাকছেন। আর ওই কোয়ার্টারই হচ্ছে তার অপকর্মের মূল আস্তানা। প্রায় সময় নারী কর্মচারীরা ওই কোয়ার্টারে যাতায়াত করেন। টাকা লেনদেনের সব হিসাব-নিকাশও হয় ওখানে। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিটের পাশে পানের দোকান বসিয়ে দিয়েছেন ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিব। তিনি প্রতি সপ্তাহে ওই দোকান থেকে ভাড়া হিসেবে টাকা নেন। অথচ ক্যান্সার ইউনিটটি স্পর্শকাতর ইউনিট। এই ইউনিটের পাশে পান সিগারেটের দোকান বসানো সম্পূর্ণ বেআইনি। হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। ওই বিভাগে প্রতিদিনই আসেন এক্সিডেন্ট, সংঘর্ষ নানা আহত রোগীরা। তাদের অধিকাংশ রোগীরই তাৎক্ষণিক জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন হয়। ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিব ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের নিজের পছন্দের লোককে সব সময় ডিউটি দিয়ে থাকেন। অপ্রয়োজনী ওষুধগুলো রোগীকে ফেরত না দিয়ে তার লোকজন বিক্রি করে দেয়। আর এতে লভ্যাংশের একটি বড় অংশ পান রওশন। ওসমানীর দু’টি ওটি হচ্ছে রওশন হাবিবের আয়ের অন্যতম উৎস। দু’ভাবে তিনি রোস্টার ভিত্তিতে আয় করে থাকেন। যাদের নিয়ে ওই ওয়ার্ডে ডিউটিতে দেন তারা প্রতি রোস্টারে (১০ দিন পর) ওয়ার্ড মাস্টারকে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়। আর অপারেশনের পর অপ্রয়োজনী ওষুধ বিক্রির টাকার বড় অংশ পান তারা। এ কারণে বাইরের অনেক ফার্মেসির মালিক হাসপাতালের ওটিতে থাকা রোগীর জন্য ওষুধ বিক্রি করতে চান না। হাসপাতাল এলাকার এক ফার্মেসির মালিক জানিয়েছেন, অপারেশনের পর ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিবের লোকজন বেশির ভাগ ওষুধ ফেরত নিয়ে আসে। এবং ওষুধের বিনিময়ে টাকা নিয়ে নেয়। ফলে রোগীদের কথা চিন্তা করে তারা অনেকেই ওটিতে অপারেশন সরঞ্জাম ও ওষুধ বিক্রি করতে চান না। ওসমানী হাসপাতালে ওয়ার্ড সংখ্যা ২৭টি। সব ওয়ার্ডে জনবল বণ্টনের দায়িত্ব ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিবের। তিনি জনবল বণ্টনের নামে কর্মচারীদের কাছে ওয়ার্ড বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে রোস্টার বা প্রতি ১০ দিন পর পর তাকে নির্ধারিত হারে টাকা দিতে হয়। যেসব কর্মচারীরা টাকা কম দেন কিংবা দেন না তাদেরকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এ কারণে ওসমানী হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ড যেনো কর্মচারীদের আয়ের উৎস। ওয়ার্ডে বেড পেতে লাগে টাকা। অনেক সময় বেড খালি থাকলেও রোগীরা মাটির বিছানায় থেকে সেবা নিয়ে থাকেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রোগী কিংবা তার স্বজনকে নাজেহাল করেন। এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় হাসপাতালে।

জরুরি বিভাগে টাকা ছাড়া ট্রলি পাওয়া যায় না- ওসমানীতে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু ওই ট্রলি বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করেন রওশন হাবিব। এছাড়া রয়েছে চোরদের উপদ্রুব। চুরির ঘটনায়ও কখনো কখনো কর্মচারীদের নিয়োজিত লোকের নামও শোনা যায়। ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে এখন আউটসোর্সিংরে ঠিকাদার বুশরা সার্ভিসেসে লি.। এই কোম্পানীতে নিয়োগের নামে টাকা আদায়সহ নানা ঘটনায় বিতর্কিত ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিব। আউটসোর্সিংয়ে অনেক মহিলা কর্মচারী রওশন হাবিবের নেক নজরের কারণে চাকরি পেয়েছেন। এদিকে রওশন হাবিবের বিরুদ্ধে সম্প্রতি মহিলা কর্মচারীর দায়ের করা জিডির তদন্ত করছেন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জয়নাল। তিনি গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, জিডির তদন্তের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছি। আদালতের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তদন্ত কাজ শুরু করবেন বলে জানান। তবে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগের খবর তার কাছে নেই। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিবের বক্তব্য: তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগকে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার রওশন হাবিব। তিনি দাবি করেছেন- একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল তার বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে। ওই মহলটি হাসপাতালের অভ্যন্তরেরই কেউ বলে দাবি করেন। বলেন, তার স্ত্রীর সঙ্গে এখন আর বনিবনা নেই। পারিবারিক কারণেই তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ওসমানী হাসপাতালের ধোপা কোয়ার্টারে বসবাস করেন। ওই কোয়ার্টারে মেয়েকে দেখাশোনার মানুষ আছে তাই তিনি বসবাস করেন বলে জানান। এছাড়া হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটারসহ অন্যান্য সেক্টরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।