Main Menu

সিলেটে নেই ফরেনসিক ল্যাবঃ ভরসা ঢাকা ও চট্টগ্রামের ল্যাবে

মশাহিদ আলী: চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতায় প্রলম্বিত হয় বিচারকার্য। ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ড,ধর্ষণ, চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে অপরাধ ও অপরাধী সনাক্তে প্রয়োজন হয় ফরেনসিক ল্যাবে রাসায়নিক ও ভিসেরা রিপোর্ট।কিন্তু প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট বিভাগের কোথাও ফরেনসিক ল্যাব না থাকায় এখনো ভরসা করতে হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ল্যাবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সকল ধরণের রিপোর্ট ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। নির্ভূল রিপোর্ট ও ক্লু-লেস ঘটনার তথ্য উদঘাটনে ল্যাবের কোন বিকল্প নেই। যার ফলে নানা জটিলতায় পরতে হয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের। পুলিশ সূত্র জানা যায়, সিলেটে ফরেনসিক ল্যাব না থাকায় রাসায়নিক ও ভিসেরা রিপোর্টের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম দৌঁড়াতে হয়। অনেক সময় রিপোর্ট পেতে দেরি হয়। এতে মামলার আলামত নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা থাকে। যার ফলে আদালতের পক্ষে মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হয় না।

জানা যায়,সিলেট বিভাগের চার জেলার বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ,হত্যা নানা ধরনের অপরাধ ঘটছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ,র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আলামত সংগ্রহ করছে। সেগুলো চট্টগ্রাম ও ঢাকায় পাঠাতে হয়। পরে সেখান থেকে আবার রিপোর্ট সিলেট আসছে।মধ্যখানে অনেক দিন অতিবাহিত হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফরেনসিক ল্যাব অনেক আগেই নির্মাণ হয়েছে। গেল বছরের ৩ ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহীতে ফরেনসিক ল্যাব নির্মাণ করা হয়। অবশ্য এসময় আইজিপি ড.মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছিলেন সকল জেলায়ই ফরেনসিক ল্যাব হবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান,ফরেনসিক পরীক্ষাগারটিতে রাসায়নিক,ভিসেরা,হস্তলিপি,ফিঙ্গারপ্রিন্ট,ফটোগ্রাফি, ব্যালিস্টকস,অনুবিশ্লেষণ,পদচিহ্ন,ক্রাইমসিন,জালনোট শনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। পরীক্ষাগারে ভিসেরা, নারকোটিক ও এসিড টেস্টসহ আরও কয়েকটি আইটেম পরীক্ষা করা যায়। মাদকদ্রব্য,মৃত মানুষ ও পশু-পাখির ভিসেরা,কবর থেকে তোলা হাড়,চুল,মাটি ও সফট টিস্যু,বিষাক্ত বা চেতনাশক পদার্থের উপস্থিতি,আলামতে রক্তের উপস্থিতি,এসিড মিশ্রিত আলামতে রক্তের উপস্থিতি,বিস্ফোরক দ্রব্য,দাহ্য পদার্থ,জাল টাকা শনাক্তসহ বিভিন্ন আলামতের রাসায়নিক বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।

এছাড়া ফিঙ্গারপ্রিন্ট শাখায় ক্রাইম সিন থেকে সংগৃহীত দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান আঙুলের ছাপের সঙ্গে সন্দেহভাজনদের আঙুলের ছাপের তুলনামূলক পরীক্ষার সুবিধা ও এ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ মত এবং সংগৃহীত ফিঙ্গারপ্রিন্ট লেটেস্ট প্রিন্ট এএফআইএস ডাটাবেজে সংরক্ষিত ফিঙ্গার প্রিন্টের সঙ্গে তল্লাশি করে মিল বা অমিল খুঁজে বের করা সম্ভব হয় ফরেনসিক ল্যাব দ্বারা।

ক্লু-লেস মামলার একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্লু-লেস বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটনে আদালত সিআইডিকেই নির্দেশ দিয়ে থাকেন। অপরাধের রহস্য

উদঘাটনে কর্মকর্তাদের আলামত নানা পরীক্ষা করাতে হয়। সিলেটে কোন ল্যাব না থাকায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম পাঠাতে হয়। এতে সময় লাগে। পরীক্ষার রিপোর্ট পেতেও দেরি হয়। এদিকে সিলেটে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন সিলেটবাসীর সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

এব্যাপারে হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ ট্রাষ্ট অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন খান বলেন,সিলেট বিভাগে ফরেনসিক ল্যাব না থাকায় দীর্ঘ মেয়াদী আইনগত জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। লোক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের সমস্যাও সৃষ্টি হচ্ছে। ল্যাব না থাকার কারণে অনেক সময় দেখা যায় ভুক্তভোগীরা তাদের ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।তাই মামলার জট এড়াতে ও ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে অতিদ্রুত সিলেটে ফরেনসিক ল্যাব জরুরী।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেট শাখার সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন,প্রবাসী অধ্যুষিত একটি এলাকা সিলেট। কিন্তু বিভাগীয় মেডিকেল কলেজে ফরেনসিক ল্যাব নেই। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। অতিশীঘ্রই যাতে ল্যাবটি স্থাপন করা হয় সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানাই।

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা.শামসুল ইসলাম বলেন, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন মর্গে সিলেট বিভাগের জনগুরুত্বপূর্ণ ময়নাতদন্ত সম্পাদন হয়ে থাকে। সুষ্ঠু তদন্ত ন্যায় বিচার নিশ্চিত করণে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য ফরেনসিক ল্যাব অতীব প্রয়োজন। ঢাকা, চট্টগ্রামের পর রাজশাহীতে ফরেনসিক ল্যাবের কার্যক্রম চলমান।মামলার দীর্ঘসূত্রিতা দূরীকরণে সিলেটে ও বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরী।

তিনি বলেন,দেখা গেছে ভিসেরা রিপোর্ট আসতে এক মাস থেকে দেড় মাস সময় লেগে যাচ্ছে।কোনো কোনো সময় এর থেকে বেশি সময় যাচ্ছে। কিন্তু যদি ল্যাব আমাদের মেডিকেল কলেজে থাকতো তাহলে এই রিপোর্টটি কম সময়ের মধ্যে পেয়ে যেতাম।এতে বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন হতো।

সিলেট জেলা আইনজীবী সাবেক সভাপতি ও সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসালম বলেন, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে আধুনিক একটি ফরেনসিক ল্যাব অত্যন্ত জরুরী। সিলেট বিভাগের অন্য কোথাও মেডিকেল কলেজ নেই সেহেতু বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হিসেবে ওসমানী মেডিকেল কলেজে ফরেনসিক ল্যাব দরকার। অনেক সময় দেখা যায় একটি প্রতিবেদনের জন্য এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রতিবেদন আসতে সময় বেশি লাগায় বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়। তাই সিলেটে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি পরিপূর্ণ ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হোক।যাতে মানুষ দ্রুত তাদের ন্যায় বিচারটুকু পায়। কেনন মামলায় যত সময় যায় তত আসামী ও বাদী উভয় পক্ষের ব্যায়বার বাড়তে থাকে।

সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মাহফুজুর রহমান বলেন,প্রতিটা মামলাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঠাতে হয়। সেগুলো আসতে আসতে দেরি হয়।তখন দেখা যায় মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হচ্ছে। এতে ন্যায় ‍বিচার থেকে অনেক বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ অবস্থা থেকে যত দ্রুত জেলায় জেলায় ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা জরুরী।আর যদি তা না হয় তাহলে বিভাগীয় মেডিকেলগুলোতে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হোক।এতে মানুষ সঠিক বিচার পাবে।মামলার জট কমে আসবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অফিসার বিএম আশরাফ উল্ল্যা তাহের সিলেট প্রতিদিনকে বলেন, সিলেটে একটি ফরেনসিক ল্যাব তৈরির প্রক্রিয়া চলমান। সিলেটে ল্যাব না থাকায় ভিসেরা পাঠাতে এবং প্রতিবেদন সিলেট এসে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। কারণ,চট্টগ্রামে অনেক জেলা থেকে ভিসেরা যায়। প্রতিবেদন কতদিন পরে আসবে,তা তাদের ওপর নির্ভর করে।

সিলেটের পুলিশ সুপার (এসপি) ফরিদ উদ্দিন সিলেট প্রতিদিনকে বলেন,সিলেটে ফরেনসিক ল্যাব না থাকায় চট্টগ্রাম আলামত পাঠাতে হয়। লকডাউন চলাকালে বিভিন্ন মামলার আলামত চট্টগ্রাম ও ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়েছে। ওই সময়ে যাতায়ত খুব কষ্টদায়ক ছিল। কোনো কোনো সময় মামলার আলামত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও আমাদের কাজ করতে হয়। সিলেটে ফরেনসিক ল্যাব থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সুবিধা হতো। ল্যাব থেকে দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া যেত। এছাড়া আদালতে মামলার বিচারকাজেও আসবে গতি।

সূত্রঃ সিলেট প্রতিদিন






Related News

Comments are Closed