Main Menu

সিলেটে ডিসি অফিস বনাম দুদক

ডেইলি বিডি নিউজঃ সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শীর্ষ কর্তাদের চিঠি দিয়ে সম্পদের হিসাব তলব করা হয়েছে। আর এক অফিস সহকারীর ঘুষের অভিযোগ তদন্তে দুদকের একটি টিম হাজির হয় ডিসি অফিসে। এ নিয়ে রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে, যার জের এখনো চলছে। মামলা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সহ অন্যান্য ম্যাজিস্ট্রেটদের বিরুদ্ধে। দুদক ও মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে ঘটনার তদন্ত করছে।
দুদক-ডিসি অফিস টানাটানির শুরু গেল বছরের শেষ থেকে। ২০১৬ সালের ১১ই ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি নোটিশে চমক তৈরি করেছিলো সিলেটে। জেলা প্রশাসনের শীর্ষ ৩ কর্তার সম্পদের হিসাব তলব করা হয়েছিলো ঐ নোটিশে। ৭ দিনের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয় সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. জয়নাল আবেদীন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও সহকারী কমিশনার (এনডিসি) তানভীর আল নাসীফকে। হিসাব জমা দেয়ার জন্য সময় চেয়েছিলেন তারা। এরই মাঝে ৭ই ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুর্নীতি অনুসন্ধানে যায় দুদকের একটি দল। ২০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে এক অফিস সহকারীকে আটক করতে প্রশাসনে হাজির হয় দুদকের উচ্চ পর্যায়ের দলটি। এ নিয়ে রীতিমতো হুলস্থুল বেঁধে যায় ডিসি অফিসে। হামলার শিকার হয় দুদকের দলটি আর ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন অভিযুক্ত ব্যক্তিটি। ৩ শীর্ষ কর্তাকে নোটিশ আর অফিস সহকারীকে আটকে উচ্চ পর্যায়ের অভিযান- এ দুটোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি-না ভাবাচ্ছে অনেককেই। আর ২০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ডিসি অফিসের এক কর্মচারীকে আটকে বিশাল টিম নিয়ে দুদকের অভিযান নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এরই মাঝে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদোন্নতি পেয়ে নিয়মতান্ত্রিক বদলির বিষয়টিকে ‘হামলার ঘটনায় প্রত্যাহার’ বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় রহস্য আরো জটিলই হয়ে উঠে। বিদায় বেলায় এ নিয়ে বেশ বিব্রতই হন জেলা প্রশাসক মো. জয়নাল আবেদীন। ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের বদলির বিষয়টির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি অপপ্রচারকারীদের বিচার চান সিলেটবাসীর কাছে।

একটি সূত্রে জানা গেছে, দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ দুদকের কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রতিনিধি দল নিয়ে ২০১৬ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সিলেট এসেছিলেন। সিলেট অবস্থানকালে তাদেরকে সার্কিট হাউসে ৫টি রুম বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে মর্যাদা অনুসারে দুদক কমিশনার সিলেটের জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্য যথাযথ সম্মান ও সহযোগিতা পাননি। শীর্ষ কর্তাকে নিজ এলাকায় যথাযথ সম্মান দিতে না পারায় সিলেটের দুদকে এ নিয়ে জেলা প্রশাসনের প্রতি কিছুটা ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়। সে অসন্তোষের সূত্রে দুদক ও সিলেটের জেলা প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। তবে দুদক বা জেলা প্রশাসন কোনো পক্ষ থেকেই এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আরো একটি সূত্র বলছে, সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সিলেটে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে দুদকের সম্পর্কে শীতলতা দেখা দেয়। এ ব্যাপারেও কোনো পক্ষ থেকে কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আকারে ইঙ্গিতে এর আভাস ঠিকই দিয়েছেন।

ডিসি, এডিসি, এনডিসি’র হিসাব তলব প্রসঙ্গে দুদক সূত্রে জানা গেছে, সিলেট নগরীর শাহজালাল উপশহর এলাকার জনৈক ব্যক্তি ডিসির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট চারটি বিষয়ে অভিযোগ করেন। জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় বেনামে কয়েকটি ফ্ল্যাট ক্রয়, লোকাল রিসোর্স (এলআর) ফান্ডের টাকা লুটপাট এবং দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে জলমহাল, বালুমহাল, পাথর কোয়ারি, হাট ইজারা দেয়ার। এছাড়া ডিসি ও এনডিসির বিরুদ্ধে সিলেট সার্কিট হাউসের বরাদ্দকৃত টাকা লুটপাটের অভিযোগ করা হয়। ডিসির এসব দুর্নীতির কাজে এডিসি সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তে নামে দুদক। তদন্তকালে ডিসি জয়নাল আবেদীনের আগের কর্মস্থল ও নেত্রকোনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব থাকাকালীন সময়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সম্পদের হিসাব চেয়ে ডিসি, এডিসি ও এনডিসিকে নোটিশ দেয়া হয়।
নোটিশে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদ বিবরণীর পাশাপাশি ডিসির কাছে চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। এর মধ্যে গত দুই অর্থবছরের (২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬) জেলা প্রশাসনের আওতাধীন ইজারাকৃত জলমহাল, পাথরকোয়ারি, বালুমহাল ও হাটবাজার, এলআর ফান্ডের আয়-ব্যয়ের বিবরণী, সার্কিট হাউসের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং পরিবহন পুলে বরাদ্দ করা অর্থের পরিমাণ ও ব্যয়ের বিবরণী দাখিলের কথা বলা হয়। তথ্য সরবরাহে দুদকের কাছে সময় চাওয়া হয় ডিসি, এডিসি, এনডিসির পক্ষ থেকে।

দুদক-ডিসি অফিস চিঠি চালাচালির মাঝেই ৭ই ফেব্রুয়ারি দুদকের সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক শিরীন পারভীনের নেতৃত্বে সিলেটের সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মনজুর আলম চৌধুরী, উপ-সহকারী পরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার, তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগসহ পুলিশ সদস্য মিলিয়ে ১১ জনের টিম উপস্থিত হয় ডিসি অফিসে। উদ্দেশ্য, ২০ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে ফাঁদ পেতে ডিসি অফিসের ব্যবসা-বাণিজ্য শাখার অফিস সহকারী মো. আজিজুর রহমানকে আটক করা। দুদক টিমের এ অভিযানের সময় নাটকীয় ঘটনা ঘটে ডিসি অফিসে। হাতাহাতির মাধ্যমে আটককৃত আজিজুর রহমানকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন ডিসি অফিসের কর্মচারীরা। এমনকি দুদকের টিমকে আটকেও রাখেন তারা। পরে ডিসির হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন আজিজুর রহমান। চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আজিজুর রহমানকে, সেখান থেকে ঢাকায়। ঢাকা থেকেই ১৩ই ফেব্রুয়ারি আটক করা হয় আজিজুর রহমানকে। ইতিমধ্যে দুদকের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি ঘটনার তদন্তে নামে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় মন্ত্রণালয় থেকেও। ঘটনার সময়ের ৬টি ভিডিও ফুটেজ রয়েছে দুটো তদন্ত দলের কাছেই। ১৪ই ফেব্রুয়ারি আজিজুর রহমানকে আসামি করে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে  কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন দুদকের সহকারী উপ- পরিচালক ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগ। ১৬ই ফেব্রুয়ারি সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ঘটনার দিনে করা দুদকের সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক শিরীন পারভীনের জিডিটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। জিডির সূত্রে সে মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্যান্য ম্যাজিস্ট্রেট।






Related News

Comments are Closed