Main Menu

সেনাবাহিনীর আরো একটি সফলতাঃ প্রস্তুত মেরিন ড্রাইভ

ডেইলি বিডি নিউজঃ বদলে যাচ্ছে সাগরদুহিতা কক্সবাজার। এতে পাহাড় আর সমুদ্রের অনন্য মিশেলের নান্দনিকতায় নতুন পালক যুক্ত হচ্ছে এবার। বিশ্ববাসীর জন্য আরও অবারিত হচ্ছে এই শহরের সৌন্দর্য। এক হাজার ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই পর্যটন শহরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেরিন ড্রাইভওয়ে এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। ৬ মে শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করবেন।

গেল সপ্তাহে দুইবার দূরবর্তী সতর্ক সংকেতে থাকা এই সমুদ্রশহরে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে উন্নয়নকর্মীদের মনে যেন  হিমেল হাওয়ার পরশই এনে দিল সরকারের এই মেগা প্রকল্প সুসম্পন্ন হওয়ার বার্তাটি। মুম্বাইয়ের ‘কুইন্স নেকলেস’ প্রকল্পকেও হার মানাবে বাংলাদেশের এই মেরিন ড্রাইভওয়ে। এর মধ্য দিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নতুন পরিবেশে দেখবেন সাগর, পাহাড় আর সড়কের অনন্য রূপ, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার স্বচ্ছ জলরাশি, পাথুরে ইনানী সৈকত, পাটোয়ার টেকের পাথরে স্তূপের শোভা ও সড়কপাশের বিস্তীর্ণ উপকূলের ঝাউবাগানের সৌন্দর্য। পর্যটকদের আকর্ষণের নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মেরিন ড্রাইভ সড়কটি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সুসম্পন্ন হয়েছে জাতীয় উন্নয়নে নতুন পালক যুক্ত হওয়া এই প্রকল্প।

প্রধানমন্ত্রীর গেলবারের সফরেও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ছিল। কথা রেখেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও। তিনি জুনের আগেই এর উদ্বোধনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। সে অনুযায়ী দুই মাস বাকি থাকতেই প্রকল্পটির কাজ এখন ঠিক উদ্বোধনের আগেকার ‘ফিনিশিং টাচ’-এ। সেনাবাহিনীর ১৬ ইসিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী হাসান মেরিন ড্রাইভওয়ের নির্মাণ প্রস্তুতি বিষয়ে উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, প্রকল্পটি দেশের ‘পর্যটন খাতের মেরুদণ্ড’। তিনি বলেন, ‘তিন ধাপে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া মেরিন ড্রাইভওয়েটি বিশ্বে সবচেয়ে বৃহৎ। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত এই মেরিন ড্রাইভওয়ে নির্মাণে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা তো ছিলই। নির্মাণকাজ করতে গিয়ে সমুদ্রের লোনাজল কখনো কখনো গ্রাস করেছে নির্মাণসামগ্রীকেও।   তা সত্ত্বেও সুসম্পন্ন হয়েছে এর কাজ। ’ অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতা ছিল বলেও জানালেন কক্সবাজারের উন্নয়ন সংগঠকরা।

কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভওয়ে নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। তখন প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। ওই সময় সড়ক ও জনপথ বিভাগ কক্সবাজার কলাতলী পয়েন্ট থেকে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করলে কলাতলী মোড় থেকে পাইওনিয়ার হ্যাচারি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক সাগরের প্রবল ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এর দায়িত্ব পায় সেনাবাহিনীর প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়ন। সড়কটির দৈর্ঘ্য বেড়ে ৮০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে নব উদ্যমে কাজ শুরু করে সেনাবাহিনী। কাজের মান বৃদ্ধির জন্য সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ মূল সড়ককে তিন ধাপে ভাগ করে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে প্রকল্পটিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে ১৭টি সেতু এবং ১০৮টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে কলাতলী থেকে ইনানী ২৪ কিলোমিটার, দ্বিতীয় পর্যায়ে ইনানী থেকে শিলখালী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এবং তৃতীয় পর্যায়ে শিলখালী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আরও ৩২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়। সব মিলিয়ে মোট ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ২৪ কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৪ কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং তৃতীয় পর্যায়ে ৩২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৫৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

সওজ বিভাগ সূত্রে প্রকাশ, মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে থাকবে ওয়াকওয়ে, পর্যটকদের সুবিধার্থে থাকবে সড়কজুড়ে ফ্লেক্সিবল পেভম্যান, শেড, গাড়ি পার্কিং ও মহিলা পর্যটকদের চেঞ্জিং রুমসহ অনেক সুবিধা। ৮০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে তিনটি বড় আরসিসি সেতু, ৪২টি কালভার্ট, তিন হাজার মিটার সসার ড্রেন, ৫০ হাজার মিটার সিসি ব্লক এবং জিও ট্যাক্সটাই থাকছে। কক্সবাজারের এই উন্নয়নের প্রবাহ সমুদ্রের ঊর্মিমালায় বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামেও এসে পৌঁছেছে। শুধু পর্যটন খাত নয়, জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি ইতিবাচক বিশেষ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুব আলম। বাংলাদেশ-ভারত-চীন-মিয়ানমার— চার দেশীয় চেম্বারের এই সহ-সভাপতি বলেন, মেগা প্রকল্পটির পাশাপাশি মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প ও সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দরসহ অন্য মেগা প্রকল্পগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পাদন সম্ভব হলে শুধু কক্সবাজার নয়, বদলে যাবে বাংলাদেশের চেহারা। কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি লেখক সাংবাদিক আবু তাহের জানান, অন্তত ২৬টি মেগা প্রকল্পের কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে এই পর্যটন শহর ঘিরে। ক্ষমতাসীন দলে যত বিভক্তিই থাকুক, কক্সবাজারকে সাজাতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে সরকারের কোনো কার্পণ্য নেই। কক্সবাজারে আবাহনী ক্লাব লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ নাজনিন সরওয়ার কাবেরী মনে করেন, বিশ্বের বৃহত্তম সৈকত শহর হিসেবে এমনিতেই দিনে দিনে কক্সবাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক মানের তারকা খেলোয়াড়সহ বিশ্ব পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ছে। টেকনাফে বিশেষ পর্যটন স্পট তৈরির কাজ চলছে। মেরিন ড্রাইভওয়ের ফলে সামগ্রিক উন্নয়নে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। অন্যদিকে উন্নয়নের এই মহাযাত্রার অংশীদার হয়ে মেরিন ড্রাইভওয়ে উদ্বোধন করতে প্রধানমন্ত্রীর অত্যাসন্ন সফর ঘিরে প্রস্তুতিরও কমতি নেই কক্সবাজারে। দলীয় ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সভা গতকালও হয়েছে। প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর এবারকার কক্সবাজার সফরে মেরিন ড্রাইভওয়ে উদ্বোধন উন্নয়নের ইতিহাসে নতুন কালের সূচনা— এমনই মন্তব্য কক্সবাজারের কুতুবদিয়া-মহেশখালী আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিকের।

 






Related News

Comments are Closed