Main Menu

গণমাধ্যম ও আমার ভাবনা

রাহাত তরফদারঃ মুক্তচিন্তা ও সব মত বা পথের মতামত প্রতিফলিত হয় নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যমে । ব্যাক্তি বা মহল বিশেষ কেউই ভুল-শুদ্ধের উর্ধে নয় , গঠনমূলক সমালোচনা সর্বদাই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত , তা হোক যেকোন সংবাদ মাধ্যমের । কিন্ত সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় কখনো কখনো কতিপয় মহল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে ঢাল হিসাবে ব্যবহারের হীন অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকেন । যা অত্যন্ত দুঃখজনক , অনভিপ্রেত দৃষ্টিকটু ও বটে । পরশ্রীকাতর ও অসুস্হ মানসিকতায় আক্রান্ত কিছু ব্যক্তি বিশেষের ‘প্রপাগান্ডা’ বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশই কেবল তা কখনো নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যমের ধর্ম হতে পারে না । সত্যের জয় অনিবার্য তাই শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে সৎ থাকা এবং সুপথে চলার মধ্যেই এক অসাধারণ ছন্দ খোঁজে পাওয়া যায় , যা জীবনে মাথা উচু করে চলতে শেখায় এবং কর্মক্ষেত্রে আত্মতৃপ্তির খোরাক ও যোগায় । ‘গোয়েবলস থিওরি’ আমরা অনেকেই জানি । জোসেফ গোয়েবলস খুব ঝানু রাজনীতিবিদ ও হিটলারের খুব কাছের মানুষ ছিলেন । তাঁর যুক্তি ছিল ‘যত মিথ্যা তথ্যই হোক যদি সত্য বলে বেশি বেশি প্রচার করা যায় আমজনতার কাছে তা সত্য বলে বিশ্বাস হবেই’ । মিথ্যা তথ্যকে সত্য বলে সুন্দর করে প্রচারে পারদর্শিতার জন্য তাঁকে হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তথ্যমন্ত্রী (Minister of Propaganda) এর দায়িত্ব দিয়েছিলেন । যদি ও সময়ের পরীক্ষায় গোয়েবলস থিওরী উত্তীর্ণ হতে পারেনি ।

একটি গল্প করার লোভ সামলাতে পারছি না ২০১৩ সালের মে মাসের কথা হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে ঢাকা অবরুদ্ধ পারিবারিক সফরে তখন বিলাতের লেস্টার শহরে অবস্হান করছিলাম , কোন এক রাতে খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুঁর তোলার বদলে রীতিমতো আতংকিত বোধ করছিলাম । কারণ ঘুরতে আসার সুবাদে এক আত্মীয়ের বাড়ি গেছি দাওয়াত খেতে , গৃহকর্তার স্ত্রীকে দেশের সাম্প্রতিক পরিস্তিতিতে খুব উৎকন্ঠিত মনে হলো । খাবার টেবিলে , দেশে নাশকতায় ট্রেনের বগি পুড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন । এরপর কলেজ পড়ুয়া ছেলে , স্বামী ও শাশুড়ির কাছে নাশকতার কারণ হিসেবে সরকারের ‘বাড়াবাড়ি’ র কড়া সমালোচনা করলেন এবং এখানেই শেষ নয়,সরকারের বিরুদ্ধে দুই সহস্রাধিক ‘নিরীহ’ মানুষকে হত্যা করে লাশ গুম করার অভিযোগ ও আনলেন । আমরা যে আসলেই অতি গুজবপ্রিয় জাতি সেদিনই চাক্ষুস প্রমাণ পেলাম । হাজার মাইলের ভৌগলিক দূরত্ব নয় বরং সকল কৃতিত্বের দাবীদার ছিল ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা বাহারী নামের বেনামী কিছু অনলাইন নিউজপোর্টালের জন্য । যদি ও সংবাদ প্রকাশের একালের জনপ্রিয় মাধ্যম অনলাইন দৈনিকসমূহ । তারপর ও ছাপা কাগজের জনপ্রিয়তায় ভাটা এখনো সেরকম পড়েনি । আলোচিত ‘পদ্মা সেতু’ নিয়ে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতি, ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ এনেছিল কানাডার আদালতে তা প্রমাণিত না হওয়ায় অভিযোগটি নাকচ করে দিয়েছে আদালত । এতে বিশ্ব পরিমন্ডলে বাংলাদেশ যে হারানো ভাবমূর্তি ফিরে পেল তা বলার অপেক্ষা রাখে না । প্রায় সবাই একবাক্যে বলছে বিশ্বব্যাংকের সরকারের জবাব চাওয়া উচিত । কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও সরকারের এই কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়ির সুযোগে দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তিকে তুলোধুনা করা কতিপয় মিডিয়ার শাস্তির মাপকাঠি কে নির্ধারণ করবে ? অথবা সংবাদ মাধ্যমকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে নৈপথ্যের কারিগর হয়ে কে বা কারা কলকাঠি নেড়েছেন তা অবশ্যই খুজে বের করা উচিত । যাকে নিয়ে সর্বোচ্চ সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে, রাজনীতি ও মন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে তিনি সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। এ অভিযোগ দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুরু থেকেই বড় গলায় বলে আসছিলেন । আবুল হোসেন যে একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ সে কথা ও অকপটে বলেছিলেন কিন্তু নিন্দুকেরা তা ঠাট্টাচ্ছলে উড়িয়ে দিয়েছিল । এমনকি ড. মশিউর রহমানের মতো মানুষকে ছুটিতে পাঠানো এবং আবুল হাসান চৌধুরীর মতো অক্সফোর্ডে পড়া সুশিক্ষিত রাজনীতিবিদকে হেনস্তা করার মাধ্যমে তাদের সামাজিক ও মানসিক ভাবে হেয় করা হয়েছে । পদ্মা সেতু দুর্নীতি নিয়ে বিরোধী দলই নয় , বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ও সুশীল সমাজ অবস্থান নিয়েছিল তাতে সরকারকে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয়েছিল । যার প্রভাব পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে ব্যাপকভাবে পড়েছিল । দল হিসাবে আওয়ামীলীগকে এর মাশুল দিতে হয়েছিল । যেসব মহল পদ্মা সেতু নিয়ে সেদিন বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন, তাদের অবশ্যই ক্ষমা চাওয়া উচিত ।

যে কারো সিদ্ধান্ত চিন্তা-ভাবনা ও ব্যাক্তিগত মতামতে কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করে গঠনমূলক সমালোচনা করলে সাদরে গ্রহণ করার উচিত । কারণ সমালোচনাকারী মাত্রই বিরোধীতাকারী নয় । দোষ-গুণ চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দেওয়াই নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যমের কাজ হওয়া উচিত । এক্ষেত্রে গঠনমূলক সমালোচনাকারীকে নি:সন্দেহে সাধুবাদ জানানো উচিত । শুধু বাংলাদেশ বা তৃতীয় বিশ্বের গণমাধ্যমই নয়, পশ্চিমা দুনিয়ায়ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম মার্কিন নির্বাচনে কে জিতবেন এই প্রশ্নে হিলারি ক্লিনটনকেই জিতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভোটযুদ্ধে ট্রাম্পের বিজয় বিশ্ব গণমাধ্যমের সব পরিসংখ্যানকে পরাস্ত করেছে , সব হিসাব-নিকাশ ভুল প্রমাণিত হয়েছে । গণমাধ্যম বড় ধরনের হোচঁট খেয়েছে । অবশ্য ট্রাম্প ও কম যাননি , একহাত নিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমগুলোকে । ‘সিএনএন’ ‘ক্লিনটন নিউজ নেটওয়ার্ক’ সম্প্রতি ট্রাম্পের এমন মন্তব্যই মিডিয়ার প্রতি তাঁর রুষ্টতারই বহি:প্রকাশ । তবে আশার কথা এই যে পত্রিকার পাতা থেকে চায়ের কাপে বিতর্ক অথবা সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেয়ার মতো শক্তিশালী অবস্হানে রয়েছে দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো । কোন সংবাদে সরকারের ইমেজ ক্ষু্ন্ন হয়েছে দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে অথবা জনগণ ব্যথিত হয়েছে কিংবা সরকারের জনপ্রিয়তায় আঘাত হয়েছে আর নাহলে রাজনীতিবিদ হিসেবে কারো ক্যারিয়ারও তছনছ হয়েছে এমন অভিযোগ আর প্রশ্নবান সমাধান বা ক্ষতিকে পুষিয়ে দিতে পারবে না নিশ্চিত । জাতিগত ভাবেই বাহবা দিতে কার্পণ্য করলে ও পরচর্চায় সিদ্ধহস্ত আমরা । কেবলমাত্র দোষারূপের চর্চা থেকে আমাদের প্রত্যেককে বেরিয়ে আসতে হবে । সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলতে হবে । কেননা শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া কোন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়।

লেখক পরিচিতিঃ সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।






Related News

Comments are Closed