Main Menu

হকির কোথাও নেই সিলেটের কিংবদন্তি জুম্মন লুসাই!

ডেইলি বিডি নিউজঃ হকিতে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলা একমাত্র বাংলাদেশি হকি খেলোয়াড় তিনি। এই ‘তিনি’ হচ্ছেন জুম্মন লুসাই; হকির কিংবদন্তী। আশির দশকে বিশ্ব হকি অঙ্গনে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন জুম্মন লুসাই। বাংলাদেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই হকি তারকা যেন বিস্মৃত হয়ে গেছেন। দেশের হকির কোথাও যেন উচ্চারিত হয় না এই ‘সোনার ছেলের’ নাম। তাঁর পরিবারের কেউও এখন হকির সাথে তেমনভাবে জড়িয়ে নেই। নানা টানাপোড়েনে চলছে জুম্মন লুসাইয়ের পরিবার।

আবাহনীর সাথে রক্তের সম্পর্কেই যেন জড়িয়ে গিয়েছিলেন জুম্মন লুসাই। দীর্ঘ ১৭ বছর আবাহনীর হয়ে দাপটের সাথে খেলেছেন। ২০১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি ওই আবাহনী ক্লাবের অফিসেই ব্রেন স্ট্রোক করেন জুম্মন লুসাই। দ্রুত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। দুই দিন লড়ে হাসপাতালেই জীবনের মায়া ছেড়ে ওপারে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তী।

জুম্মন লুসাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন কিছু করার আশ্বাসের ফুলঝুরি ছুটেছিল। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শ্রী বীরেন শিকদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, জুম্মন লুসাইয়ের নামে মাওলানা ভাসানী জাতীয় হকি স্টেডিয়ামে গ্যালারির একটি অংশের নামকরণ করা হবে। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন থেকে বলা হয়েছিল, প্রতি বছর জুম্মন লুসাইয়ের নামে একটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হবে। ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ও হকি ফেডারেশনকে এমন নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, জুম্মন লুসাইয়ের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।

বাস্তবে এসব আশ্বাস, এসব প্রতিশ্রুতির কোন কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। জুম্মন লুসাইয়ের মৃত্যুর আড়াই বছর পরও ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে তাঁর নামে গ্যালারির নামকরণ হয়নি, তাঁর নামে হকি টুর্নামেন্ট চালু করেনি ফেডারেশন, আর্থিক সহযোগিতাও পায়নি পরিবার।

জুম্মন লুসাইয়ের একমাত্র বোন মারিয়ান চৌধুরী মাম্মি। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মারিয়ান চৌধুরী মাম্মি বলছিলেন, ‘ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হকি স্টেডিয়ামের গ্যালারি নামকরণের আশ্বাস দিলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার থেকে আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। দৈন্যদশার মধ্যে আছে জুম্মনের পরিবার।’

জুম্মন লুসাইয়ের পরিবারের জন্য আরেক বেদনাগাথা হচ্ছে, তাঁর ছেলে ডেভিড লুসাই গত ৩০ তারিখ মারা গেছেন। মা থানপুই লুসাই, ভাই রিচার্ড লুসাই ও কেলভিন লুসাইয়ের সাথে ভারতের মিজোরামে বেড়াতে গিয়েছিলেন ডেভিড। সেখানে হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে মারা যান ডেভিড। সেই শোক জুম্মন লুসাইয়ের পরিবারে এখনও চলছে।

জুম্মনের জন্মস্থান সিলেট। কিন্তু এখান থেকে কিছুই জুটেনি তাঁর কপালে। তাঁর মৃত্যুর পরও একটি আলোচনা সভাও করা হয়নি সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থা (ডিএসএ)’র পক্ষ থেকে। এমনকি মৃত্যুবার্ষিকীতেও তাঁকে স্মরণ করার প্রয়োজনবোধ করে না জেলা ক্রীড়া সংস্থা।

মারিয়ান চৌধুরী মাম্মি দুঃখ করে বলছিলেন, ‘জুম্মন বাংলাদেশের একমাত্র খেলোয়াড়, যে বিশ্ব একাদশের হয়ে হকি খেলেছে। অথচ সেই তাঁকে সিলেটে একটি সংবর্ধনা দেওয়ার গরজ দেখায়নি ডিএসএ। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতেও কোনো স্মরণসভা করা হয় না। আমরা পারিবারিকভাবেই তাঁকে স্মরণ করি। সিলেটের ছেলে হিসেবে তাঁকে কোনো মুল্যায়নই করা হয়নি।’

‘জুম্মন তোষামোদি করতো না, তাঁর অভাব-অনটন ছিল। এজন্য সে মূল্যায়িত হয়নি।’ বলছিলেন মারিয়ান চৌধুরী মাম্মি।

হারেঙ্গা লুসাই ব্রিটিশ আমলে পুলিশে চাকুরি করতেন। কিন্তু হকির প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান। তাঁর দেখানো পথ ধরেই হাঁটেন সন্তানরা। হারেঙ্গা লুসাইয়ের ছয় ছেলে, এক মেয়ে। জুম্মন ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে ষষ্ঠ। জুম্মনের বড় ভাই সাঙ্গুরা লুসাই পাকিস্তান জাতীয় হকি দলে খেলেছেন। আরেক ভাই ধনধন লুসাইও জাতীয় দলে খেলেছেন। চেমাম লুসাই দীর্ঘদিন হকি খেলেছেন। জুবেল লুসাইও আবাহনী, মোহামেডানের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে হকি খেলেছেন। জুম্মন লুসাইয়ের ফুফাতো ভাই রামা লুসাই একাধারে হকি ও ফুটবল খেলে গেছেন।

‘এঁদের কেউই কোথাও মূল্যায়িত হয়নি। কেউই হকির কোথাও নেই। আমি অনেকটা জোর করেই সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার হকি কমিটিতে সদস্য হিসেবে ঢুকেছি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে নেই আমরা কেউই।’ অভিমানমিশ্রিত কণ্ঠে বলছিলেন সিলেট মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদিকা মারিয়ান চৌধুরী মাম্মি। মেয়েদের খেলাধুলায় আগ্রহী করে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন ঐতিহ্যবাহী হকি পরিবারের মেয়ে মারিয়ান চৌধুরী। তাঁর হাত ধরেই সিলেটে মহিলা ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়। তাঁর দাবি, ‘জাতীয় হকি স্টেডিয়ামে জুম্মনের জন্য কিছু একটা করা হোক।’

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশের হয়ে প্রথম বিভাগে খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করেছিলেন জুম্মন লুসাই। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় দলের ডিফেন্সে খেলেছেন তিনি। ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট সিলেটে জন্ম নেওয়া জুম্মন লুসাই ১৯৮২ সালে ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৯ম এশিয়ান গেমসে খেলেন। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় এশিয়া কাপে বিশ্ব হকি অঙ্গনে ঝড় তোলেন তিনি। ৩২ বছর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই এশিয়া কাপ হকিতে ইরানের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করেন জুম্মন লুসাই। যেটি ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কোনোও খেলোয়াড়ারের প্রথম ও একমাত্র হ্যাটট্রিক। ১৯৮৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ১০ম এশিয়ান গেমসও খেলেন জুম্মন লুসাই। ১৯৮৯ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় এশিয়া কাপ খেলে আন্তর্জাতিক হকি থেকে অবসরে যান তিনি। এরপর ১৯৯৫ পর্যন্ত আবাহনীর হয়ে খেলে গেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জড়িয়েছিলেন আবাহনীর সাথে।

মৃত্যুর পর তো কিছুই জুটেনি, জীবদ্দশায়ও যেন হয়েছিলেন উপেক্ষিত। ২০১১ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন জুম্মন লুসাই। এরপর আরো চার বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়েও তাঁর হাতে জাতীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়নি। মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জিতে চিরনিদ্রায় শায়িত থাকা জুম্মন লুসাইকে পরবর্তীতে মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রদান করা হয়।






Related News

Comments are Closed