Main Menu

সিলেটে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা, কতিপয় বাধা এবং আমাদের করনীয়

এম আরিয়ানঃ পর্যটনকে দীর্ঘকাল নিতান্তই বিলাসিতা ভাবা হতো। আগের যুগে শুধু বিত্তশালীরা বিভিন্ন উপলক্ষে দেশ-বিদেশ ঘুরে দেখতেন। শিল্প বিপ্লবের পর এ ধারা বদলাতে শুরু করে। মেশিনের সাহায্যে স্বল্পসময়ে বেশি উৎপাদন করার ক্ষমতা মানুষকে দেয় বেশি ছুটি কাটানোর সুযোগ, ফলে বিস্তৃত হয় ভ্রমণের গতি-প্রকৃতি। গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে শিল্প খাতটি। গোটা বিশ্বে বছরে দেড় বিলিয়নের মতো পর্যটক ভ্রমণ করছে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর ৮০ লাখের মতো মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়। ঈদের ছুটিতে মোটামুটি ১০ লাখ পর্যটক দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ করে, যাতে কমপক্ষে আড়াই হাজার কোটি টাকার হাতবদল হয়। এ শিল্পের জন্য যেটা অত্যন্ত আশার দিক। তাছাড়া পর্যটনই একমাত্র শিল্প খাত, যার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্রমাগতভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সফলতা পাচ্ছে। ফলে সত্যিকারভাবে মনোযোগী হলে এ খাতে বিনিয়োগের তুলনায় রিটার্নটা অনেক বেশিই পাওয়া সম্ভব। কারণ তৈরি পোশাক রফতানি করে ১০০ ডলার পাওয়া আর পর্যটকের কাছে সমপরিমাণ অর্থ আয় করার মধ্যে নিট আয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য।

সিলেট অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্পট হলো দুই ওলির ‘দরগাহ’। সময়ের অভাবে শিডিউলে যতই কাটছাঁট হোক না কেন, পর্যটকরা কখনো দরগাহ জিয়ারত মিস করতে রাজি নন। অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও এ বিষয়ে একই রকম আগ্রহী। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় সিলেট শহরের হোটেলে সিট পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে; অথচ পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথভাবে এ বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করা হয় না। অধিকাংশ আয়োজনকে আমরা সাদামাটাভাবে দেখি এবং স্থানীয় লোকজনের মাথায় যে আইডিয়া আসে, সেগুলোর বাস্তবায়ন থেকে যৎসামান্য সুবিধা লাভ হয়। দূরদূরান্ত থেকে যারা সিলেট ঘুরতে আসেন, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে স্বভাবতই হাতে গোনা কয়েকটি স্পট বাছাই করতে হয়। এক্ষেত্রে পর্যটকদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে: হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের দরগাহ, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, জাফলং ও পিয়াইন নদী, বিছনাকান্দি, পর্যটন মোটেল এলাকা, লাওয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, শ্রীপুর পার্ক, জৈন্তাপুর রাজবাড়ী, হাকালুকি হাওড়, টাঙ্গুয়ার হাওড়, মালনীছড়া ও লাক্কাতুরা চা বাগান, মাধবপুর লেক, শ্রীমঙ্গলের বিস্তৃত চা বাগান, সারিঘাট থেকে ডাউকি সীমান্ত, ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি, চা গবেষণা কেন্দ্র, এক্সেলসিওর (জাকারিয়া সিটি), অ্যাডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড ও ড্রিমল্যান্ড পার্ক।

এখনো দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ভ্রমণকারীরা সিলেট শহরকে কেন্দ্র করেই ট্যুর পরিকল্পনা করেন। অথচ রাজধানী থেকে প্রতিটি জেলা সদরে সরাসরি বাস চলাচল করে এবং আবাসিক ব্যবস্থাও (অন্য জেলাগুলোয়) বেশ ভালো। তাই চারটি জেলার যদি স্বতন্ত্র পর্যটন ইমেজ গড়ে তোলা যায়, তবে পর্যটকরা একেকটি জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য যথেষ্ট সময় পাবেন এবং নিবিড়ভাবে সেই এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে— উপরে যে স্পটগুলোর নাম লেখা হয়েছে, এর বাইরে আবার দেখার কী আছে? আসলে সিলেট অঞ্চলে অনেক দর্শনীয় স্থান আছে, যা যথাযথভাবে উপস্থাপন হয়নি। ফলে দর্শনার্থীদের মধ্যে ওই বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জিন্দাবাজারের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে রাজা’স মিউজিয়াম। সেখানে অনেক নিদর্শন আছে, যা ইতিহাস ও সুফিবাদের ভক্তদের জন্য বিপুল রসদ ধারণ করছে। এমনিভাবে ওসমানী জাদুঘরসহ অসংখ্য সম্পদ আছে, যার যথাযথ উপস্থাপন সিলেটের পর্যটন খাতকে করতে পারে আরো সমৃদ্ধ।

সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বাধাঃ দেশের পর্যটন খাত নানা কারণেই যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি এবং বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাত থেকে উল্লেখযোগ্য অর্জন খুব কম; সিলেট অঞ্চলও তার ব্যতিক্রম নয়। জাতীয় প্রেক্ষাপটে কিছু সীমাবদ্ধতা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং বিদ্যমান সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ব্যর্থতাই প্রধান প্রতিবন্ধক বলে চিহ্নিত করা যায়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী ভ্রমণপিপাসুরা ভাবেন, কোনোমতে সিলেটে পৌঁছতে পারলেই মজা করে দর্শনীয় সব স্থান ঘুরে দেখা যাবে। ব্যাপারটি তেমনই হওয়ার কথা ছিল। খুলনা, রাজশাহী বা দিনাজপুর থেকে যারা কয়েকশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সিলেটে পৌঁছেন, তাদের কাছে শহর থেকে ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা তেমন কঠিন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু একা বা ছোট পরিবার নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া যারা সিলেটে ঘুরতে আসেন, তারাই বুঝতে পারেন মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত ঠিক কতটা দুর্গম (!) এলাকায় অবস্থিত।

পর্যটন খাতের জন্য কার্যকর কিছু করা অন্য যেকোনো শিল্পের তুলনায় কঠিন। কারণ এটি একক কোনো শিল্প খাত নয়। পরিবহন, আবাসন, বিনোদন, প্রাকৃতিক সম্পদের বৈচিত্র্য ইত্যাদির মতো বৃহৎ খাতগুলোকে সমন্বিতভাবে একই ধারায় আনতে পারলে তবেই সুফল পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে বড় সমস্যা হলো, এর মালিকানার ধরন। যেমন— সিলেটের পর্যটন খাতের উন্নতি করা দরকার। প্রশ্ন হলো, কে করবে? ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তারা হয়তো হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পার্ক নির্মাণ করবেন কিংবা বাস, উড়োজাহাজ কিনবেন কিন্তু রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা, সামগ্রিক প্রমোশন কে করবে? নিশ্চয়ই সরকার বা তার মনোনীত সংস্থাকে সেগুলো করতে হবে। এখন প্রশ্ন, সরকারের কোন মন্ত্রণালয় করবে? যোগাযোগ, স্বরাষ্ট্র, সাংস্কৃতিক, পর্যটন নাকি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়— এ এক বিরাট ধাঁধা। আমাদের মতো দেশে অন্তত ১৬টি মন্ত্রণালয়ের একই লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিতভাবে কাজ করা সহজ ব্যাপার নয়। হয়তো সে কারণেই ভাগের মরা যেমন গঙ্গা পায় না, তেমনি অনুন্নত দেশের পর্যটন খাত সঠিক পথের দিশা খুঁজে পায় না।

দর্শনার্থীদের আরো একটি অভিযোগ হলো, অনেক কষ্ট করে দূরদূরান্ত থেকে একটা স্পটে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরেই দেখার মতো আর কিছু থাকে না। যেমন— ঢাকার এক কলেজের শিক্ষার্থীরা ৮ ঘণ্টা বাস জার্নি করে জাফলং পৌঁছে ঘণ্টা দুয়েক কাটানোর পরে হতাশা প্রকাশ করছিল। অথচ সারা বিশ্বে এখন ইনহেরিটেড সম্পদকে সাপোর্ট দিতে ‘ক্রিয়েটেড’ অসংখ্য ট্যুরিজম প্রডাক্ট ডেভেলপ করা হচ্ছে। দুঃখের বিষয়, আমরা ন্যাচারাল রিসোর্সগুলোকেও ঠিকমতো লিংক করতে পারছি না। যেমন— অনেকেই একাধিকবার জাফলং বেড়াতে গেছেন, কিন্তু তার খুব কাছেই যে খাসিয়াপুঞ্জি আছে— যাদের জীবন ও পেশা (সমতলে বসবাসকারী মানুষের জন্য) মজার অভিজ্ঞতা হতে পারে— সেখানে যাননি; হতে পারে না-জানার কারণেই যাওয়া হয়নি। সিলেট অঞ্চলের নানা অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ ‘পান ও সুপারি’র এক বড় অংশ আসে এ পল্লী থেকে। এখনো কলকাতাসহ ভারতের অনেক বিয়ের অনুষ্ঠানে তারা পান সরবরাহ করে! কথিত আছে, অমিতাভ বচ্চন তার ছেলের বিয়েতে অতিথি আপ্যায়নের জন্য এখানকার ‘সাঁচি পান’ নেয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন।

জাফলং, ভোলাগঞ্জ, সারিঘাট বা লালাখালে কমন একটি সমস্যা চোখে পড়ে। মনে হয়, বালি ও পাথর উত্তোলনের প্রতিযোগিতা চলছে। সেখানে পর্যটকরা সবসময়ই অবহেলিত; মালিক, শ্রমিক ও দোকানিদের দাপট লক্ষণীয়। যে স্থানটি ঘুরে দেখার জন্য মানুষ শত শত মাইল ভ্রমণ করে আসে, সেখানে তাদের ন্যূনতম অধিকার সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অধিকতর মনোযোগী হওয়া দরকার। পর্যটকদের জন্য সুবিধাজনক ও নিরাপদ এলাকা সংরক্ষণ করে তবে উত্তোলন কাজের অনুমতি দেয়া দরকার। তদুপরি স্যানিটেশন অবস্থা অনেক স্পটেই খুব খারাপ অথচ এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাছাড়া সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকলে আশপাশের পরিবেশ ভয়াবহভাবে দূষিত হয়। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে হাজার হাজার শ্রমিক এলাকাটিকে হাঁটাচলার অনুপযোগী করে রাখেন। অন্যদিকে এখন ছোট ছোট অনেক গ্রুপ সারি ঘাট থেকে লালাখাল দিয়ে ডাউকি সীমান্ত পর্যন্ত ঘুরতে যায়। কিন্তু সেখানে টি-প্রসেসিং ফার্মটির টয়লেট ও টিউবওয়েল ছাড়া কোনো বন্দোবস্ত নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কখনো এটি পর্যটন এলাকা হিসেবে নজরে আসবে কিনা কে জানে! আর নজরে পড়লেইবা কী? লাওয়াছড়াকে ‘ন্যাশনাল পার্ক’ ঘোষণা করা হয়েছে (প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশী পর্যটকও আসেন গবেষণার কাজে) অথচ সেখানে টয়লেটের যে সংখ্যা ও মান, তা মোটেই সন্তোষজনক নয়।

পৃথিবীর পর্যটন শিল্পে উন্নত দেশগুলো (নেপাল, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড) সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ট্যুরিস্টদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার দিকগুলোকে সর্বোত্তম করতে। দিন যত যাচ্ছে, এসব দেশে সেবার মানও ক্রমে বাড়ছে; অথচ আমাদের দেশে হয় তার উল্টো। একসময় পর্যটকদের জন্য সিলেট-জাফলং সড়কে বিআরটিসির বিশেষ বাস সার্ভিস ছিল। তখন যৌক্তিক ভাড়ায় জাফলং ভ্রমণটি বেশ উপভোগ্য ছিল। অজানা কারণে সেই সার্ভিস এখন বন্ধ। ফলে প্রাইভেট বাস কোম্পানিগুলোর মর্জিমাফিক যাত্রীদের যাতায়াত করতে ও ভাড়া গুনতে হয়। তবু জাফলং সড়কটি মোটামুটি ভালো হওয়ায় পর্যটকরা শিডিউল অনুযায়ী ভ্রমণ শেষ করতে পারেন। কিন্তু পাবলিক বাসে পরিবার-পরিজন নিয়ে মাধবকুণ্ড, ভোলাগঞ্জ বা লাওয়াছড়ার মতো স্পটগুলোয় যাতায়াত প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। ভোলাগঞ্জের রাস্তা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, সেখানে রিজার্ভ যেতেও গাড়িওয়ালারা অনীহা প্রকাশ করে। রাজি হলে ভাড়া গুনতে হয় অনেক বেশি। তাছাড়া কষ্ট করে সে স্থানগুলোয় গিয়ে রাত্রিযাপনের তেমন ব্যবস্থা নেই সন্ধ্যার পর পথে রয়েছে ছিনতাইকারীর উপদ্রব। ফলে রংপুর বা বরিশাল থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ সিলেটে পৌঁছার পরেও সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে আর ওইসব দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার সাহস করে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পর্যটন শিল্প বিকাশের পথে বিরাট অন্তরায়।

সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে করণীয়ঃ পর্যটন খাতের উন্নয়ন বিষয়ে ভাবতেই আমাদের মাথায় আসে ‘সরকার’ সবকিছু করবে। যে দেশে বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সঙ্গত কারণেই পর্যটন খাত অগ্রাধিকার তালিকায় বেশ পেছনে থাকবে। তাছাড়া যেসব দেশ এ খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছে, সেগুলোয় সরকার মূলত রাস্তাঘাট ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে। তারপর প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছে। সরকারকেই সবকিছু করতে হবে সেটা জরুরি নয়, দরকার ‘পলিসি সাপোর্ট’; যা বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছন্দে কাজ করতে উৎসাহী করবে। পাশাপাশি রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ‘ফেয়ার প্লে’র পরিবেশটা নিশ্চিত করবে। বাকিটা দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীরাই করবেন, অধিকাংশ দেশে সেটাই হয়।

প্রবাসীদের পাঠানো যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সিলেট অঞ্চলে আসে, তার বড় অংশ ব্যয় হয় অনুৎপাদনশীল খাতে। যদি পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগে তাদের বিশেষ কিছু প্রণোদনা দেয়া যায়, তবে বহুমুখী সুফল পাওয়া সম্ভব। বিভিন্ন দেশে কাজ করার সুবাদে তারা যেমন ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, ঠিক তেমনিভাবে অসংখ্য বিদেশীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে তারা বিনিয়োগ করলে স্থানীয় কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রমোশনের কাজটাও সহজ হবে। তবে উদীয়মান শিল্প হলেও এখন পর্যন্ত দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ খুব সামান্যই নেয়া হয়েছে। পর্যটন-বিষয়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের জন্য এ বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। পর্যটকদের সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রদানের জন্য সমৃদ্ধ ওয়েবসাইট ডেভেলপ করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে একটি এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলাও খুব দরকার।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উত্সব রাসলীলা অথবা দোলযাত্রাকে কেন্দ্র করে বার্ষিক বড় মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। দুই বা তিন দিনব্যাপী সে মেলায় আঞ্চলিক ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেমন— টিপরা, মণিপুরি, খাসিয়া ও গারোদের হাতে তৈরি বাহারি পোশাক, বাঁশ ও বেতের তৈজস (বিশেষ করে শীতলপাটি) ও আসবাব, উৎপাদিত ফলমূল ইত্যাদি ব্যাপকভাবে প্রদর্শন ও বিক্রয় করা যেতে পারে। প্রতি বছর রাজশাহীর পুঠিয়া শিবমন্দিরে ভারত, নেপাল, ভুটান ও তিব্বত থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তীর্থযাত্রী অংশ নেন। এক্ষেত্রেও প্রতিবেশী দেশগুলো (বিশেষত সেভেন সিস্টার্স) থেকে আগ্রহীরা আসতে পারেন। তাছাড়া যে অর্ধশতাধিক দেশের নাগরিকের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা চালু আছে, সেসব দেশের নাগরিকদের কাছে বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা; পাশাপাশি এ শিল্পের জন্য বিপুলসংখ্যক দক্ষ ও যোগ্য কর্মী গড়ে তোলা খুব জরুরি।

লন্ডন ও সিলেটকে লিংক করা এ অঞ্চলের পর্যটনের বিকাশে খুবই দরকার। অনেকেই ভাবতে পারেন, লন্ডনে সিলেটি বংশোদ্ভূত বর্তমান প্রজন্ম সিলেট কিংবা দেশে আসতে চায় না। কিন্তু এ ধারণা যে সঠিক নয়, তা ‘অন্তর্যাত্রা’ সিনেমায় দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। আসলে ঝকঝকে তকতকে দালানকোঠায় যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, প্রতিনিয়ত শিডিউল চেজ করে, ‘মেকি ফান’ রিপিট করে তারা বড় ক্লান্ত। সত্যিই যদি তারা বাংলার প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ পায়, দাদা-নানার বাড়িতে হূদয়ছোঁয়া ভালোবাসা পায়, তাদের সাহেবি মোড়কের অভ্যন্তরে দুরন্ত ও উত্সুক যে মনটি আছে, তা বের হয়ে আসবে। অনেক মা-বাবাই নানা বাস্তব কারণে তাদের দেশে আনতে ভয় পান। যে সিস্টেম ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখান থেকে দেশের প্রচণ্ড গরম, অসহ্য লোডশেডিং, ভয়াবহ যানজট, গ্রাম্য খাবার, আইন-শৃঙ্খলার দুরবস্থা ইত্যাদিতে তাদের সন্তানরা বিরক্ত হবে— এ ভয়েই তারা হয়তো সাহস করেন না। এ শঙ্কার দেয়াল ভাঙতে হবে।

এক্ষেত্রে মিডিয়া (নাটক ও সিনেমা, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, সংবাদপত্র) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। লন্ডনে বাংলা অনুষ্ঠানগুলো দেখার সময় সন্তানদের যদি ওই লোকেশনগুলো ভালো লাগে, তখন তারা আগ্রহী হতে পারে; অভিভাবকরাও গর্ব করে বলবেন— ওটাই আমাদের দেশ! তখন সন্তানদের আগ্রহে মা-বাবা হয়তো সাহস ফিরে পাবেন। আর একবার ভালো লাগলে তারা বাঙালি কমিউনিটির বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়গুলো শেয়ার করবেন। এতে তাদেরও আগ্রহ সৃষ্টি হবে। একবার যদি সেটা শুরু হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পর্যটন শিল্পের সমৃদ্ধি নিঃসন্দেহে সুদৃঢ় হবে। বিনা পরিচর্যাতেই সিলেট দীর্ঘদিন থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটক পাচ্ছে এবং ক্রমে সে সংখ্যা বাড়ছে। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার বিশেষ মনোযোগ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তাহলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হবে স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড ইমেজ, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক ও জাতীয় উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে।






Related News

Comments are Closed