Main Menu

প্রকৃতির আমন্ত্রণে হারং হুরংয়ে

সুমন্ত গুপ্তঃ সিলেট শহরের মালনীছড়া চা বাগানের আশপাশে অবস্থিত হারং হুরং। সিলেটি ভাষায় হারং মানে সাঁকো বা বিকল্প পথ, আর হুরং মানে সুড়ঙ্গ। অর্থাৎ হারং হুরং মানে বিকল্প সুড়ঙ্গ পথ। তেলাহাটির দক্ষিণে হিলুয়াছড়া চা বাগানের ১৪নং সেকশনের পাশে অবস্থিত হারং হুরংয়ে পৌঁছতেই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পাহাড় আর জঙ্গল যেন শুভেচ্ছা জানাল। সপ্তাহের পাঁচদিন অফিসের কাজে ডুবে থাকার পর শুক্রবার এলেই ঘরে বসে থাকতে মন চায় না, বেরিয়ে পড়ি নতুন কিছুর সন্ধানে। তবে এবারের অভিজ্ঞতাটা একটু অন্যরকম। ফেসবুকের কল্যাণে বন্ধু কল্লোল দেবের কাছ থেকে সন্ধান পেলাম প্রাচীন এক সুড়ঙ্গ। নাম হারং হুরং। সিলেট শহরের মালনীছড়া চা বাগানের আশপাশে অবস্থিত এ সুড়ঙ্গ, শুধু এ টুকুই জানতে পেরেছি। দুই সপ্তাহ ধরে পরিকল্পনা করে যাওয়া হয়ে উঠছিল না, শেষ পর্যন্ত আমরা রওনা দিলাম প্রাচীন হারং হুরং সুড়ঙ্গের উদ্দেশে। সিলেটি ভাষায় ‘হারং’ মানে ‘সাঁকো বা বিকল্প পথ’ আর ‘হুরং’ মানে ‘সুড়ঙ্গ’। অর্থাৎ ‘হারং হুরং’ মানে হলো বিকল্প সুড়ঙ্গ পথ।
.
কথিত রয়েছে, ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সিলেটে আগমনের খবর পেয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দ তার সৈন্যবাহিনীসহ পেঁচাগড় গিরিদুর্গের সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পরন্ত দুপুর আমার সঙ্গী ডেনি শর্মা, অজয় আর সঞ্জয়। বাগানের আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করতে হবে এ ভেবে আমরা দুই চাকার যানকে সঙ্গী করে নিলাম। চৌহাট্টা, আম্বরখানা লাক্কাতুরা চা বাগানকে পাশ কাটিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম চা বাগান মালনীছড়ার মূল কার্যালয়সংলগ্ন রাস্তার মাথায়। উপমহাদেশের বাণিজ্যিক চা উৎপাদনের শুরুটা এ বাগান থেকেই, লর্ড হার্ডসনের হাত ধরে। আমাদের কেউই রাস্তা চিনি না, তাই সিদ্ধান্ত হলো একজন পথ প্রদর্শক নিয়ে যাত্রা শুরু করব। বাগানের মুখে বেশ কয়েকজনকে দেখলাম জটলা করে বসে আছে, জিজ্ঞেস করলাম হারং হুরং সুড়ঙ্গ চেনেন নাকি, সবার মুখের ভাব দেখে মনে হলো চেনেন না। পরে মনে হলো রাজা গৌর গোবিন্দের কথা বললে হয়তো চেনবে। ঠিক তাই হলো। আমরা বাগানের এক কুলিকে পথপ্রদর্শক হিসেবে পেলাম, নাম জগন্নাথ।
.
বাগানের পথ ধরে এগিয়ে চলছি। এক-দেড় কিলোমিটার পরেই বাগানের বালুময় পথের শুরু। দুপাশে নাতিউচ্চ টিলায় সুবিন্যস্ত চায়ের বাগান, তার মধ্যে সোজা আকাশের দিকে ওঠে যাওয়া গাছ মিলে আশ্চর্য এক সবুজের ধারা তৈরি করেছে। অসাধারণ এক প্রাকৃতিক মোহের মধ্যে আমরা এগিয়ে চলছি। বৃষ্টির ফলে বাগানের ছড়াগুলোয় পানির প্রবাহ বেশি আর পানির কলকল শব্দে মন ভরে যায়। কিছু কিছু পথ খুব ভাঙাচোরা, খুব সাবধানে দুই চাকার যান নিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। আমি একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছি। চলতি পথে কথা হলো জগন্নাথের সঙ্গে। সে বলল বাগানের লোকদের কাছে হারং হুরং সুড়ঙ্গ গৌর গোবিন্দ রাধা গুহা নামে অধিক পরিচিত। তারা প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে পূজা দেয় এখানে। আমরা পৌঁছে গেলাম তেলিহাটি চা বাগানে। শুরুতেই ছোট বাজারের মতো, রয়েছে কিছু চায়ের দোকান, চা শ্রমিকদের কিছু ঘর, রাগীব-রাবেয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় আর একটা মসজিদ। আমরা চলছি হঠাৎ করে জগন্নাথ বলে আমরা বাবু ভুল পথে চলে এসেছি, রাস্তাটা অন্যদিকে হবে হয়তো। আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন, আমি সামনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসি। আমরা ভাবলাম রাস্তাটা খুব চমত্কার, জগন্নাথ রাস্তার খোঁজ নিয়ে আসুক, এ ফাঁকে আমরা ছবি তুলে নিই। আমি মনের আনন্দে ছবি তুলছি, আর রাজেশ ডেনি ওরা সেলফি তোলায় ব্যস্ত। পরিবেশ নিস্তব্ধ, জনমানবশূন্য। মনে মনে ভাবছিলাম, এমন নিস্তব্ধ পরিবেশে মানুষ থাকে কি করে! কিছুক্ষণ বাদে দেখা গেল জগন্নাথ ঘেমে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে। সে বলল, বাবু আমার এক কাকাকে নিয়ে এসেছি, এবার আমরা যেতে পারব।
.
জগন্নাথ আর জগন্নাথের কাকা জগবন্ধুকে নিয়ে ২০ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম বুনো এক পরিবেশে। তেলাহাটির দক্ষিণে হিলুয়াছড়া চা বাগানের ১৪ নং সেকশনের পাশে অবস্থিত হারং হুরং। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পাহাড় আর জঙ্গল যেন শুভেচ্ছা জানাল হারং হুরংয়ে। হারং হুরংয়ে তিনটি সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গগুলো বেশ অন্ধকার। একদিকে সবুজ পাহাড়ি অরণ্য, আরেকদিকে সুড়ঙ্গ দেখে নস্টালজিক হয়ে গেলাম। আমরা চারজনই পালা করে সুড়ঙ্গগুলোয় ঢুকলাম, ছবি তুললাম। কিন্তু অন্ধকার আর ভয়াল পরিবেশের কারণে ভেতরে বেশিদূর গিয়ে দেখার সাহস হলো না। এর মধ্যে ডেনি ভেতরে কিসের যেন শব্দ শুনতে পেল। উত্সুক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলাম বাদুড় ভেতরে। মূল সুরঙ্গটি বালিভর্তি হয়ে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। থেমে থেমে টিলা চুইয়ে আসা পানির টিপটিপ শব্দ আর বাদুরের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ নিশ্চিতভাবে কোনো হরর ছবির কথা মনে করিয়ে দেবে। বড় সুড়ঙ্গটায় দাঁড়ানো যায়, তবে একটু এগোলেই মাটির দেয়াল দিয়ে বন্ধ করা। প্রচণ্ড স্যাঁতসেঁতে, দেয়ালে শ্যাওলা। মোবাইলের আলোয় সুড়ঙ্গের অন্ধকার ভেদ করা গেল না। বেশি ভেতরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড় থাকা খুবই স্বাভাবিক। হয়তো অনেক রহস্যও লুকিয়ে রয়েছে এখানে। তার মধ্যে এক খোঁড়লের মধ্যে মোমবাতি আর আগরবাতি দেখে বুঝলাম এখানে চা শ্রমিকরা পূজা করে। পাহাড়ি-জংলি, বন্ধুর পথে গাইড ছাড়া যে চলাফেলা করা কতটা কঠিন ও বিপজ্জনক, তা টের পেলাম। আমি প্রবীণ জগবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, সুড়ঙ্গ কোন পর্যন্ত গেছে? কেউ সুড়ঙ্গ পেরিয়ে দেখতে পারেনি? তিনি বললেন, সুড়ঙ্গটির বয়স প্রায় ৭০০ বছর বা তারও বেশি। এটাকে কেন্দ্র করে নানা লোককাহিনী স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে।  অনেকে বলে জৈন্তা পর্যন্ত এ সুড়ঙ্গ গেছে। তিনি বললেন, যারাই এর মধ্যে প্রবেশ করেছেন, তাদের কেউই নাকি জীবিত বের হয়ে আসেননি। আর যদিওবা বের হয়েছেন, তারা কিছুদিনের মধ্যে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন। উপস্থিত আরেকজন জানালেন, ভারত থেকে বেশ অনেকবছর আগে তিনজন তান্ত্রিক এখানে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের মধ্য থেকে মাত্র একজন ফিরে এসেছেন আর খুব অল্পদিন বেঁচে ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিও অস্বাভাবিক ছিলেন। এছাড়াও সিলেটের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী নাকি খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তিনি অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখে সংস্কারকাজ মাঝপথে বন্ধ করে দেন। আর এ গ্রামের এক বুড়ো জোয়ানকালে ঢুকেছিল। এরপর কী দেখে যেন ভয়ে বেরিয়ে আসে। এরপর পাগল হয়ে যায়, তেলিহাটির বিখ্যাত কবিরাজও তার চিকিৎসা করতে পারেনি। এ কথা শুনে বিশ্বাস না করলেও কিছুটা শিহরিত হলাম আমরা চারজন।
.
যেভাবে যাবেনঃ ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে অথবা ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্তঃনগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনী এবং রাতে উপবন সিলেটের পথে ছোটে,  ভাড়া ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। শহর থেকে মালনীছড়া চা বাগান ভাড়া রিকশায় ৪০ টাকা, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ৮০-১০০ টাকা। সিলেটের আম্বরখানা থেকে অটোরিকশায় সেখানে যাওয়া যায়। মালনীছড়া চা বাগানের মূল কার্যালয়ের সামনে গাইড পাবেন, তাদের নিয়ে  অটোরিকশা বা টমটমে তেলিহাটি, ভাড়া নেবে জনপ্রতি ২০ টাকা। রিজার্ভও যেতে পারেন আম্বরখানা থেকে তেলিহাটি। ২০০ টাকার মতো নেবে, আপডাউন ৪০০ তবে অবশ্যই গাইড নেবেন।

 






Comments are Closed