Main Menu

কোটিপতি এক এএসআই

ডেইলি বিডি নিউজঃ রবিউল ইসলাম। ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। ২০১৭ সালের শেষের দিকে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন এএসআই। তিনি এখন পুলিশ সদর দপ্তরের সংস্থাপন শাখায় কর্মরত। পুলিশের নিয়োগ ও বদলির বিষয় দেখা হয় এই শাখা থেকে। রবিউল ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। অভাবের সংসারে দুই সন্তানকে ফেলে চলে যান তার মা। পরে চাচার কাছেই বড় হন তিনি।

মৃত্যুর সময় মাত্র পাঁচ কাঠা জমি রেখে গেছেন তার বাবা। কিন্তু মাত্র ১১ বছর পুলিশের চাকরি করে হয়েছেন বাড়ি, গাড়ি, কোটি টাকার মালিক। মাসে বিশ হাজার টাকা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে পরিবার নিয়ে থাকেন ঢাকায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্নীতি করে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকার সম্পত্তি ও নগদ টাকার মালিক হয়েছেন রবিউল। নামে বেনামে এর বাইরে রয়েছে আরও অনেক সম্পত্তি। পুলিশের এই সদস্য চাকরির এগারো বছরে অবৈধ পথে আয় করেছেন কোটি টাকা, কিনেছেন জমি। রবিউলের নামে যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকায় আছে ৩ শতাংশ জমি। জমিটি কেশবপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে রেজিষ্ট্রি হয় ২০১৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি। দলিল নম্বর ৪৬১/১৫। দলিলে জমির দাম দেখানো হয় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

কিন্তু বাস্তবে এই জমির দাম প্রায় ২১ লাখ টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডে (কামরাঙ্গীর চর) আছে ১১৫ দশমিক ৫০ অযুতাংশ জমি (১ কাঠার কম)। দলিল নম্বর ৩৭৭০। ঢাকা সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে জমিটির দলিল রেজিস্ট্রেশন হয় ২০১৬ সালের ২৯শে মে। দলিলে জমির দাম দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই জমির বর্তমান বাজার মূল্য ৪০ লাখ টাকা। আরেকটি জমি যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকায় রবিউলের রয়েছে আরও ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি। কেশবপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে এ জমির রেজিস্ট্রেশন হয় ২০১৭ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি। দলিল নম্বর-১১৮১/১৭। দলিলে জমির দাম দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ২১ হাজার টাকা। কিন্তু জমিটির বর্তমান বাজার মূল্য অন্তত ৪৮ লাখ টাকা।

এছাড়া দক্ষিণ সিটির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে (কামরাঙ্গীর চর) আছে আরও এক কাঠা জমি। যার দলিল নম্বর ৪৪৪৫। ঢাকা সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল হয় গত বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর। দলিলে জমির দাম দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলিলে দাম কম দেখানো হলেও এই জমির বাজার মূল্য অন্তত ৫০ লাখ টাকা।

যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকায় ৭২ নম্বর আলতাপোল মৌজায় বাগান ও স্থাপনাসহ দোকান কেনা হয়েছে এএসআই রবিউলের শ্বশুর মো. শহীদুল ইসলাম ও ভগ্নিপতি মো. ইয়াছিন আলীর নামে। জমির দলিল নম্বর ২৩৬১। কেশবপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল হয় চলতি বছরের ২৯শে মে। জমির পরিমাণ যথাক্রমে দশমিক ৮৪২ শতক ও ২ দশমিক ১৫৮ শতক। দলিলে জমির দাম ৩৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ স্থানীয়রা বলছেন, জমিটির বর্তমান বাজার মূল্য ৬০ লাখ টাকা। এই জমিটি তিনি কিনেছেন শ্বশুর ও ভগ্নিপতির নামে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার শ্বশুর ও ভগ্নিপতির এই জমি কেনার সামর্থ নেই। তারা কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এদিকে ১৪ লাখ টাকা মূল্যের একটি মাহেন্দ্র পিকাপ আছে তার। পিকাপটির রেজি:নম্বর নং-১৪-৯৩০২। এসবের বাইরে তার বিরুদ্ধে দুদকেও রয়েছে অনেক অভিযোগ। অভিযোগ পত্র থেকে জানা যায়, যশোরের কেশবপুর থানার মংগল কোট গ্রামে লতিফ নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। একই গ্রামের বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে তিনি কনস্টেবল ও এ্‌সআই পদে চাকরি দেবার নাম করে অনেক টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে মংগলকোট গ্রামের এনামুল কাছ থেকে ৬ লক্ষ টাকা, পাশের গ্রাম শিকারপুর আজিজারের কাছ থেকে ১৩ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা, দেউলী গ্রামের চিনু মোড়ল থেকে ১২ লক্ষ এবং কেশবপুরের বালিয়া ডাঙ্গা হগ্রামের আফসার গাজীর কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা।

টাকা দেয়া ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই চাকরি পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত আছেন। এই অভিযোগ থেকে জানা যায়, নিজের এলকার থানা থেকে প্রভাব খাটিয়ে ডাকাতি মামলা, মাদক মামলাসহ নানান মামলা থেকে টাকার বিনিময়ে আসামিদের বাদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এদিকে রবিউলের আপন চাচা আব্দুর রাজ্জাক তাকে ছোটবেলা থেকে দেখাশোনা করলেও সেই চাচাকেই মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করে আসছেন বেশ কয়েকদিন ধরে। কয়েক মাস বাড়ি ছাড়া ছিলেন তিনি। এদিকে ১৪ই জুলাই রাজ্জাক বাড়িতে গেলে ২০১৫ সালের একটি পুরনো ভুয়া মামলা তাকে আটক করিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২৮শে জুলাই আদলতে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়াকে তাকে জামিন দেয়া হয়। এর আগে গত ১৪ই মে যশোরের কেশবপুর থানায় আব্দুর রাজ্জাকের নামে সাধারণ ডায়েরি করেন (জিডি) রবিউল। জিডি নম্বর-৫৩৯। জিডিতে রাজ্জাকের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধের কথা বলা হলেও জমির পরিমাণ ও স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি তার ঢাকার কর্মস্থল ও ঠিকানা সম্পর্কেও জিডিতে উল্লেখ নেই।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি তাকে নিজের কাছে রেখে পড়ালেখার ব্যবস্থা করেছি। কারণ যখন আড়াই বছর বয়স তার বাবা মারা গেছেন। তার মা অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সে পুলিশ হওয়ার পর ক্ষমতা দেখিয়ে আমাদেরকে পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করতে চাইছে। তার লোকজন আমাদের বসত ভিটায় হামলা চালিয়েছে। গত মাসে এই দুই সপ্তাহ জেল খাটলাম তার জন্য। তিন চার বছর আগের একটি ভুয়া মামলা দেখিয়ে আমাকে কারাগারে পাঠিয়েছে। এসবের বিচার কোথাও পাইনা। উপরওয়ালা যদি তার বিচার করে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই রবিউল ইসলাম এই প্রতিবেদককে সবকিছু অনুসন্ধান করে দেখার কথা বলেন। কিন্তু অনুসন্ধান শেষ করে, এবং সকল প্রকার তথ্য নিয়ে ফোন দেয়া হয়েছে জানালে রবিউল সত্যতা স্বীকার করে প্রতিবেদককে বলেন, আপনার যা ভালো মনে হয় তা করেন। তবে পুলিশে নিয়োগ বানিজ্যের কথাটিও তিনি অস্বীকার করেন। এদিকে রবিউল তার চাচাকে দোষারোপ করে বলেন, ছোটবেলায় আমার বাবা মারা যান। এর পর থেকেই সকল সম্পত্তি আমার চাচা ভোগ দখল করে যাচ্ছে। আমি নিজে এসব সম্পত্তি চাইতে গেলে আমাকে উল্টো মামলা হামলা দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা বলেন, রবিউলের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। এবং বিষয়টি পুলিশ সদরদপ্তর তদন্ত করছে।

সূত্রঃমানবজমিন






Related News

Comments are Closed