Main Menu

কবি গুলশান আরা রুবী’র সমালোচিত কিছু কবিতা

সমালোচক খালিদ সাইফুল্লাহঃ
উল্লেখ করে কবি তার স্বরচিত কবিতায় বলেন,আমার ইচ্ছে গুলো ডানা কাটা ঘুড়ি, কেমন করে বল আমি নীল আকাশে উড়ি।কবির কথাগুলো যদি বিশ্লেষণ করা যায় তবে প্রতিটা মানুষের ইচ্ছা, আকাঙ্খা, কামনা, বাসনা’র কাছে পরাধীন।তা-ই কবি আধুনিক সুরেলা দিয়ে কবি লিখে গেলেন তার কবিতায়।

অয়ন্ত ইমরুলের কবিতার বিশেষ প্রবণতা হল যে,আমাদের জীবনাভিজ্ঞতার বাইরের আঘাতকেও প্রচ্ছন্নভাবে ধরার একটা আকাঙ্ক্ষা সবসময় কাজ করে।চেনা শব্দের বুননে তৈরি অচেনা ভাষায় সেইসব আকাঙ্ক্ষাকে তিনি ছুঁয়ে দেন ইন্দ্রিয়প্রধান জাগতিকতার বাইরে গিয়ে।তার কবিতা সরাসরি সাময়িকের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা নয়,আড়ালপ্রিয়তার ভেতর দিয়ে সামগ্রিক ঘাত-প্রতিঘাতের গভীর এক অনুরণন।অনেকটা অ্যাবসার্ড শিল্পের মত–যে যার মত অর্থ করে নিতে পারে,যার যার জীবনাভিজ্ঞতার প্রতিফলন সেখানে নিজেদের মত করে দেখতে পায়।তার কবিতায় আছে সেই প্রিজমের ব্যবহার, যেখানে লাল,নীল,সবুজ প্রত্যেক রঙই নিজেদের আলাদাভাবে খুঁজে পায় কিন্তু প্রিজম সরিয়ে নিলে বাইরে থেকে তাদের চেনা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।তাই কবি গুলশান আরা রুবী কবি ইমরুলের মতো প্রতিভা বিকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান সময়ে।

‘এই দেশ কবে স্বাধীন হবে’ কবিতায় পাওয়া যায় প্রথাগত বৃত্তের প্রান্তস্পর্শী সেই বধির করা কম্পনের অনুভব,যেখানে এসে এক হয়ে গেছে প্রকৃতি,সুষমা ও মৃত্যুর নিশ্চলত…

এ দেশ কবে স্বাধীন হবে

মনের অন্তরালে খুঁজে মনের অন্তঃস্থল
সেখানে আছে শুধু ভালাবাসা স্তর।

হৃদয়টা আজ তান পুড়াটার মত
প্রেমের সুরে বাজে কত।
বেদনার আর্তনাদে শুধু চিৎকার করে বলতে চাই
এ কেমন দেশ কেমন মানুষ।

কোথায় তোর ভালোবাসা
কাদের জন্য দিয়েছিলে স্বর্গীয়
প্রেম বির্সজন আজ কি দেখার কেহ ছিলো।

অশ্রু ভেজা নয়নে দেখি কতশত স্বপ্ন
সেই স্বপ্নচারিনী করে কত লুকোচুরি।

মেঘের মেলায় মন যে হারায়
বেদনার বালুচরে শুল্ক বনোলতায়।

আঁচল ভিজিয়ে জল দেবো
সামনে এসে ছায়া দেবো
তোমার শরীর ভরিয়ে দেবো
শীতল জলে ।

হাজার মুক্তা মনি দিয়ে রাখবে
আরেকবার এসে কারো মুক্তির
স্বাধীনতা তোমার খোলা থাকবে আঁচলে ।

আজ তোমার বুকের আঁচলটা মা
ভিজে রক্তে ,জলের মতন ,
এ দুটি নয়ন কেঁদে কেঁদে যায় অবিরত
মা মাগো যাই বেলা শেষে বলে
এ দেশ স্বাধীন হবে কবে?

(এ দেশ কবে স্বাধীন হবে)
প্রাকৃতিক চিত্রকল্পের সাথে স্মৃতিজাগানিয়া কৈশোরিক মুগ্ধতা তার কবিতার প্রধান উপজীব্য।কবিতায় প্রায়ই ব্যবহার করেছেন ।ফলে কবিতার ঘোরলাগা রহস্যের ভেতর তা জন্ম দিয়েছে বিশেষ এক ব্যঞ্জনা, দৃশ্যকল্পনার স্বাধীনতার সাথে সাথে পাঠক অনুভব করেছেন কিছুটা শ্রবণকল্পনার স্বাধীনতাও।
যেমন
স্বাধীনতা
তোমার বুকে মাগো এ কেমন স্বাধীনতা
তুমি তো শুয়ে আছো মাগো রক্ত ভেজা আঁচল নিয়ে।
আজ কি হচ্ছে তোমার স্বাধীনতার তরে
এখনো স্বাধীন হয়নি তোমার মাগো,
পিজ ঢালা পথে কত রক্ত এখনো ঝরছে।
তোমার দেশ ভরে গিয়েছে স্বৈরাচারী আর ঘৃণাকারী রাজনীতি
এতোটি বছর পার হয়ে গেলো মাগো এখনো রাজাকারের হয়নি নিপাত
রাজাকারের বংশধর বড় বিপথগামী
দিতে চায়না স্বাধীন ভাবে বাঁচতে।
আজ তোমার স্বাধীন দেশে নেই কোন স্বাধীনতা
নেই কোন স্বাধীন ভাবে কথা বলার অধিকার।
এ কেমন দেশ মাগো ,এ কেমন জাতি মাগো
আতঙ্ক আর ভয়ে কাটে দিবানিশি।
দেশপ্রেমিকদের মৃত্যুর ভাজ আজ রাজাকারদের হাতে।

আবার কবির বিভিন্ন কবিতায় গ্রামীণ জীবনের নানা শব্দের সাথে প্রয়োগ আছে প্রচুর ইসলামিক শব্দের।ইসলামিক এই শব্দসমূহ কোথাও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে ধারন না করে তা পুরোদমে অনুগত হয়েছে সামগ্রিক কবিতার।কবিতার শব্দগুলো মূলত আমাদের পরিচিত শব্দজগত থেকেই নেয়া।ফুল,চাঁদ,বর্ষা,আকাশ,রামধনু প্রভৃতি রোমান্টিক ধাঁচের শব্দগুলোকে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মোটেও অবহেলা করেননি তিনি।আবার শব্দগুলোর ব্যবহার ঠিক রোমান্টিক কবিতার মতোও হয়ে ওঠেনি কবিতায়।যেমন–

দুই দিনের দুনিয়া

ক্ষণিকের তরে এসেছিলে এ ভুবনে
জন্মের পর মৃত্যু আছে এ কথা
সবাই জানে।
হয়তো কিছুটা সময় কাটিয়েছি
রঙের এ দুনিয়ায়
যখন চলে যাব অন্ধকার কবরে
সারে তিনহাত মাটির ঐ ঘরে।
নাই তো সেকেন্ডের ভরসা
কিসের এত আশা কিসের এতো অহমিকা
যখন চলে যাবে নিঃশ্বাস
মায়ারী বাদন ছেড়ে আপন জন ও চলে যাবে
একলা হয়ে থাকব কেমনে
ঐ আকাশ পাড়ের নীল গগনে আপন ঘরে
থাকিবে না প্রেম প্রেমের ভাজন
সবই হারিয়ে যাবে তখন।

(দুই দিনের দুনিয়া )

কবিতাটিতে কপট সভ্যতার শ্লেষাত্মক ইঙ্গিতকে প্রকট করে তোলেছেন তিনি। অনুরূপভাবে ‘মৃত্যুর’ ও ‘কবর’ কবিতায়ও দেখা যায় ইসলামিক শব্দের যথেষ্ট ব্যবহার।এছাড়া ঊদূ শব্দ সহ মেরা,রব,সহ ইংরেজি শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে তার কবিতায়।তার বেশিরভাগ কবিতাই মানবতার বহুরৈখিক প্রকাশ পেয়েছে ।তবে সাম্প্রতিক কবিতা গুলো চমৎকার সৃজন করেছেন যেমন

শুধু’ই ভাবনা “কবিতায় লিখেন

তিরিশটি বছর ভিজাইনি আমার চুলের গোড়ালি
এক ফোঁটা তেলের এক বিঁন্দু মসৃণ ছোঁয়াও লাগেনি।
না পাওয়ার দুঃখে, আর্থিক সংকটে
পারিনি সেই কেঁশে এক ফোঁটা তেল ছুঁতে।
বেঁচে আছে শরীরের তেজে রক্ত পানি খেয়ে।
তিরিশটি বছর লালন করেছে দুই ন’য়নের জলে
হাজারো বর্ণমালায় শব্দের চালে।
বুকের মাঝে একটি ছবি দোলে
হাজারো রাঙ্গা গোলাপ ফুলে ফুলে।
মনের গগনে কাঁন্না হয়ে ঝরে কি ছিল ভুল তবে
আর কি ফিরে পাব সে দিনে সে কূল।
শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ঝরে কত সংক্রমণের হলুদ পুঁজ
আজ যৌবনের ভাঁটায় ধরেছে গুণ।
রক্ত জবা হয়ে কত শত বেদনার
ফুল
এ ভুবনে জন্ম হওটাই ছিল ভুল।
বুকের লোহার কপাটে জমেছে রঙিন স্বপ্ন গুলো
স্মৃতি ওই মনের ঘরে বাসা বেঁধেছে
কঠিন পাথর গুলো।
ক্ষতচিহ্ন ক্ষত হয়েছে প্রতিনিয়ত
বেদনার নোনাজলে
ব্যথায় ভরে গিয়েছে মন জমিন
সাগর জলে
ক্ষয় হয়ে যায় পাথর সমান পাহাড় গুলো
ক্ষত হয়ে হারিয়ে যায় নীল স্বপ্ন গুলো।
শুধু নীরবে ভাবি কি ছিলো আমার ভুল
আর কি ফিরে পাবো হারিয়ে যাওয়া সে কূল।

কবিতাটি আবার একরৈখিকতার পথে চলতে চলতে শেষের দিকে এসে বাঁক নিয়েছে বহুরৈখিকতার দিকে।কবিতায়,’রক্তে ঝাঁকি দিচ্ছে বকধার্মিক’ ও ‘প্রাঞ্জল দিবসের কিছু অংশে বিমূর্ত গল্পের আড়ালে ফুটিয়ে তোলেছেন সময়ের অস্থিরতা ও যুগের পুঁতিগন্ধময় যন্ত্রণাকে।সেইসাথে কবিতায়….”সংলগ্নতার মাঝে অবাক কাকতাড়ুয়া মানুষ”–পঙক্তিতে চিহ্নিত করেছেন মানুষের করুণ ও রূঢ় বাস্তবতাকে।

কবিতায় বাক্যের শব্দ ব্যবহারে বেশকিছু নতুনত্ব দেখা যায়।বাক্যের অর্ধেক পড়ে অধিকাংশ সময়ই অনুমান করা যায় না তার পরের অংশকে।তাই পাঠক বিচিত্রতার স্বাদ পান এক্ষেত্রে।সেই সাথে তার কবিতার বিচ্ছিন্ন পঙক্তি নিয়েও।কবিতায় কতগুলো চিত্রকল্প রঙিন মার্বেলের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে,অধিকাংশ সময়ই সেখানে সংযোগের দৃঢ় সুতো থাকে না বলে তাকে মালা করে চিরকালীন সামগ্রী করা যায় না।খেলা শেষে ফেলে যেতে হয় অথবা নিয়ে যেতে।

সবাই শেয়ার করবেন প্লি।






Comments are Closed