Main Menu

ওসমানীনগর থানার ওসির হুমকী :’রশি দিয়ে বেঁধে থানায় নিয়ে আসবো’

ওসমানীনগর প্রতিনিধি ::‘নারায়নগঞ্জের এমপি শামিম ওসমানেরও টাইম ছিলোনা আমার হাতে। বানিয়াচং থাকাকালীন আব্দুল মজিদ খাঁন এমপিকেও তো পাত্তাই দেইনি। আর এখানের কোনো নেতা তো আমার চোখেই পড়েনা। এগো টাইম নেই আমার কাছে। কথা না শুনলে রশি বেঁধে একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে টেনে নিয়ে আসবো’। কথাগুলো একজন পুলিশ কর্মকর্তার। সরকারদলীয় থেকে বিএনপি, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কেউই বাদ যায়নি এই হুমকী থেকে। যখন তখন যে কারো মোবাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তার এমন হুশিয়ারী উচ্চারণ। এই পুলিশ কর্মকর্তার নাম রাশেদ মোবারক। ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে তিনি।

ওসি রাশেদ মোবারকের এমন রূঢ় আচরণের শিকার হওয়া উপজেলার উমরপুর ইউপি আ.লীগের সভাপতি শহিদ পরিবারের সদস্য দবির মিয়া, উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইকবাল আহমদ এবং উমরপুর ইউনিয়নের সালিশি ব্যাক্তিত্ব সাবেক ইউপি সদস্য তখলিছ আলী, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক উমরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান চেরাগ আলীর সাথে কথা বলে জানাগেছে এমন তথ্য। সবার মোঠো ফোনে একই রকম হুশিয়ারী বার্তা রয়েছে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ।

বৃহস্পতিবার বিকেলেও থানায় থাকা অফিসিয়াল মুঠোফোন থেকে উল্লেখিত ব্যাক্তিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে এমন হুমকি প্রদান করেন তিনি। ওসির এমন দাম্ভিকতা ও অশ্লীল ও অশোভন আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আওয়ামী লীগ অঙ্গ সংগঠনের সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ ভোক্তভোগীরা ইতিমধ্যে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির কাছে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন।কাল নালিশি অভিযোগ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের কাছে জমা দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অফিসার ইনচার্জ রাশেদ মোবারক অত্র থানায় যোগদানের শুরু থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত ঘুষ, দুর্নীতি, লুট-পাট, স্বেচ্চাচারীতাসহ নানান অনিয়মের মধ্য দিয়ে ইত্যেমধ্যে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। যোগদানের শুরুতেই তিনি অপরাধীদের ধরপাকর, মাদক, জুয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সহিত জড়িতদের ধাওয়া দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার কাজ করতেন। আর এভাবেই অপরাধীরা দলে দলে পকেটে আসতে থাকে রাশেদ মোবারকের। এর মাধ্যমেই তিনি আর্থিক সুবিধা সৃস্টি করে পকেট ভারী করছেন। রয়েছে নিরব বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও ঘুষবাণিজ্য। কোন সাধারণ মানুষ তার সামনে এসে কথা বলার সুযোগ পায়না তার বিকৃত মনোভাবের কাছে।

ওসির এই অনিয়ম বন্ধ হয়নি করোনাকালেও। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে শুরু করেন করোনা বাণিজ্যে। লকডাউন করে রাখাসহ নানা কায়দায় সাধারণ মানুষদের হায়রানী করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা। এর প্রতিবাদ করলেই ডাইরেক্ট মামলা দিয়ে কোর্টে চালান। এমন ঘটনার শিকার উপজেলার গোয়ালাবাজার ইউপির ৯নং ওয়ার্ড আ.লীগের সভাপতির পুত্র।

লকডাউন চলাকালিন সময়ে পুলিশ কর্তৃক হয়ারানীর দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারন করার অভিযোগে পরবর্তীতে ওসির কাছে মাফ না চাওয়ায় তাকে আটক করে গুজব রটনাকারী সাজিয়ে মামলা দিয়ে কোর্টে চালান করে দেওয়া হয়। লকডাউন ও গন পরিবহন বন্ধ থাকাকালিন সময়ে ঢাকা- সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের প্রবেশদ্বার শেরপুর টুলপ্লাজায় চেকপোষ্ট বসিয়ে প্রতিটি গাড়িকে নানা কায়দায় চাঁদা আদায় ও সাধারণ চালকদের মারধরের বিষয়টি জানিয়েছেন ভোক্তভোগীসহ শেরপুর টোলপ্লাজা এলাকার একাধিক বাসিন্দারা। অন্যদিকে লকডাউন চালাকালে অবাধে জনসমাগম করার বিষয়ে উপজেলার সচেতণ মহলের পক্ষ থেকে ওসিকে বিভিন্ন সময় অবগত করা হলেও ইউএনওর দোহাই দিয়ে তিনি অবগতকারীদের সাথে অশালিন আচরন করতেন বলে অনেকেই জানিয়েছেন।

উপজেলার সিকন্দরপুর গ্রামের একাধিক ব্যাক্তিরা জানান,এপ্রিল মাসের মধ্যেবর্তী লকডাউন চলাকালিন সময়ে ওসির শেল্টারে ঢাকার নারায়নগঞ্জ থেকে এক মহিলাকে সিকন্দরপুর গ্রামে আসলে গ্রামবাসীরা প্রতিবাদি হন। বিষয়টি জানাজানির পর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন ইউএনওর হস্তক্ষেপে জনৈক মহিলাকে রাতের আধাঁরে অন্যত্র সরিয়ে নিলেও বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রতিবাদি লোকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় হুমকি প্রদান করেছিলেন ওসি রাশেদ মোবারক।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায় বিগত দুই মাস ধরে করোনা ভাইরাসের পার্দুভাবের অযুহাতে ভোক্তভোগী বিচারপ্রার্থী লোকজনকে থানা এলাকায় ঢুকতে দিচ্ছেনা তিনি। একাধিক বিচারপ্রার্থী লোকজন মামলা সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে কোন রকম ওসির দরজায় যেতে সক্ষম হলেও করোনা ভাইরাসের কারণ দেখিয়ে মামলা গ্রহণ করেননি তিনি। কিন্তু টাকার বিনিময় হলে শিথিল হয় করোনার দোহাই। উপজেলার চাতলপার এলাকার এক সচেতণ ব্যাক্তি জানান, ‘সম্প্রতি ওসি রাশেদ মোবারক আমাদের এলাকায় আসলে উপস্থিত লোকজনের কথার প্রসঙ্গে তিনি সিলেটিদের নিয়ে ব্যাঙ্গাত্বক শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিছু দিন পূর্বে ওসির শেল্টারে জোরপূর্বক জায়গা দখলের পায়তারায় উপজেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সাজ্জাদকে ধরে নিয়ে আসার হুমকি দিয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট লোকজন জানিয়েছেন।

একই অভিযোগ উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইকবাল আহমদের। তিনি জানান, ‘বৃহস্পতিবার ওসি রাশেদ মোবারক অফিসিয়াল নাম্বার থেকে আমার ব্যাক্তিগত ফোনে করে বলেন,আমরা জানতে পেরেছি আপনার এলাকায় একটি সংঘাত হবে আর যদি তা হয় তাহলে আপনাকে প্রধান আসামি করে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে হিচড়ে থানায় নিয়ে আসব’। ওসির এমন দাম্ভিকতার বিষয়টি আমি তাৎক্ষনিক সিলেট জেলা ও উপজেলা আওয়ামীলীগও যুবলীগের নেতৃবৃন্দকে অবগত করার পাশাপাশি সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারকে অবগত করে রেখেছি।

উমরপুর ইউনিয়নের সালিশ ব্যাক্তিত্ব সাবেক ইউপি সদস্য তখলিছ মিয়া জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে থানার ওসি সাহাবে আমাকে ফোন দিয়ে আমার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বলেন, আপনি সংঘাত সৃষ্টি করছেন আমার কাছে তথ্য রয়েছে। এ ব্যাপারে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তিনি রশি দিয়ে বেঁধে আমাকে থানায় নিয়ে যাবেন বলে হুমকি প্রদান করে ফোনের লাইন কেটে দেন।

উমরপুর ইউপি আ.লীগের সভাপতিও মুক্তিযুদ্ধা শহিদ পরিবারের সদস্য ষাটোর্ধ দবির মিয়া ওসির এমন উদ্ধৃতপূর্ন আচরণের বিষয়ে প্রতিবেদককে জানাতে গিয়ে কান্না জনিত কন্ঠে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার আমার মোবাইলে ওসি রাশেদ মোবারকের কল আসে। তিনি বলেন, আমরা গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছি আপনার এলাকায় কিছুদিনের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা আছে। আর যদি তা হয়, তাহলে আপনাকে প্রধান আসামি করে উমরপুর থেকে রশি দিয়ে বেঁধে থানায় নিয়ে আসব। আমি ওসিকে আমার পরিচয় দিয়ে বলি আমি বায়োবৃদ্ধ মানুষ। আমার জানামতে এলাকায় কোনো সংঘাত নেই। আমার পরিচয় জানার পর তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।

ওমরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান চেরাগ আলী বলেন, আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। কোনো প্রকার জায়জামেলাও নেই।বৃহস্পতিবার বিকালে ওসি রাশেদ মোবারক আমার মোবাইল ফোনে ফোন দিয়ে জানান, আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে উমরপুর ইউনিয়নে আপনারা সংঘাতের সৃষ্টি করছেন। সংঘাত সৃষ্টি হলেও আমি উমরপুরের সবাইকে বেঁধে থানায় নিয়ে আসব। প্রয়োজনে আপনাকেও রশি দিয়ে বেধেঁ থানায় নিয়ে আসা হবে।

ওসমানীনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আতাউর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক আনা মিয়া বলেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ উপজেলা যুবলীগ সভাপতির কাছ থেকে ওসির এমন আচরনে বিষয়টি শুনে আমরা খুবই মর্মাহত হয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা পুলিশ সুপারসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্মরণাপন্ন হবো।

উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান চৌধুরী নাজলু বলেন, ওসি রাশেদ মোবারক থানায় যোগদানের পর থেকে তিনি বিচারপ্রার্থী লোকজনসহ সাধারণ মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করছেন বলে বিস্তর অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে আমরা পুলিশ সুপারসহ উর্ধ্ধতন কর্তৃপক্ষে সাথে আলোচনা করেছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে প্রয়োজনে সাধারণ মানুষদের সাথে নিয়ে আমরা ওসিকে বয়কটের সামাজিক কর্মসূচি ঘোষণা দিব।

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক অরুনোদয় পাল ঝলক বলেন, একজন ওসির কাছ থেকে এধরনের আচারণ খুবই দুঃখজনক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ওসমানীনগরের ওসি রাশেদ মোবারক বলেন, কেউ শান্তি শৃঙ্খলা বিঘিœত করার চেষ্টা করলে তাকে ধমক দিতে পারি, কিন্তু রশি দিয়ে বেঁধে আনার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি কোনো নেতা নেত্রীদের বিরুদ্ধে কখনোই কটুবাক্য করেননি বলেও জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( ওসমানীনগর) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ হাতে পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।






Related News

Comments are Closed