Main Menu

ভাবনা বদলালে বদলে যাবে পরিস্থিতিও

দেবব্রত রায় দিপনঃ সম্ভবত নবম-দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজনে’ লিখাটি পড়েছিলাম। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন-‘প্রথম প্রথম লাশ দেখতে গিয়ে আঁতকে উঠতাম। একসময় সারি সারি লাশের স্তুপ আর চোখের সামনে মৃত্যু দেখতে গিয়ে অনুভুতি গুলোও ভুতু হয়ে যায়’। করোনাকালের সংবাদ লিখতে গিয়েও প্রথম প্রথম একই অনুভুতি হতো আমার। এখন যেনো সবকিছুই একেবারে গা সওয়া ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করোনা এখন আর টিভির পর্দায় বা সংবাদপত্রের পাতায় আটকে নেই। করোনা এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির দোরগোড়ায়। বিদেশি রোগ এখন ষোলাআনা স্বদেশি। করোনার বিষাক্ত ছোবলে চোখের সামনে অকালেই নিভে যাচ্ছে জীবনদীপ। একের পর এক। তাতেও সম্বিত ফিরছে না। সরকার, প্রশাসন যখন এই অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন কেউ কেউ ব্যস্ত ফাঁকফোকর অনুসন্ধানে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সরকার যখন লকডাউন করছে, তখন অনেকেই নানা অজুহাতে বাইরে বেরনোর ফন্দি আঁটছে। মানছে না নিয়ম। মারণ ভাইরাসকে বাড়িতে আমন্ত্রণ করছে। পরিবারের সবাইকে অসুস্থ করছে। তারপরই গেল গেল রব। উঠছে সরকারের দিকে আঙুল। অথচ ভুল সংশোধনের কোনও ইচ্ছাই নেই।

দেশজোড়ে চলছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। লকডাউনের ফলে দেশবাসী পড়েছিলেন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। খাদ্যসামগ্রী মজুতের জন্য পড়েছিল হুড়োহুড়ি। কারণ মানুষ তখনও বুঝে উঠতে পারেনি, এই লকডাউন কতদিন গড়াবে? ঘরে ঘরে খাদ্যের জন্য হাহাকার পড়ে যাবে কি না! তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করতে দোকানে বাজারে জমেছিল মেলার ভিড়। কিন্তু, এখন? পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেই লক ডাউন, নেই স্যোস্যাল ডিসটেন্স মেনে চলার খবরদারি।

এখন মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দোকানে, বাজারে। লাটে উঠছে সামাজিক দূরত্ব বিধি। গা ঘেঁসাঘেঁসি করে চলছে বাজার করা। চলছে মারণ ভাইরাসকে আলিঙ্গনের প্রতিযোগিতা। আর তাতেই লকডাউনের লাভের গুড় খেয়ে নিচ্ছে পিঁপড়ে। প্রতিহত হচ্ছে না সংক্রমণ। উল্টে বেড়েই চলেছে।

আসলে এরা অনেকটা পতঙ্গের মতো। আগুন দেখলেই পতঙ্গ সেদিকেই ঝাঁপ দেয়। এরাও বিপদ সত্ত্বেও পা বাড়াচ্ছে সেই দিকেই। পতঙ্গ জানে না, আগুনে ঝাঁপ মানে মৃত্যু। আর ‘আত্মঘাতী’ বাহিনী সব জেনেবুঝেও সেদিকেই দৌড়ায়। আর কত অকাল মৃত্যু চাক্ষুষ করলে এদের ‘জ্ঞানচক্ষু’ উন্মোচিত হবে?

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি পংক্তি উল্লেখ করতে চাই- আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে। আমি চোখ মেললুম আকাশে, জ্বলে উঠল আলো পুবে-পশ্চিমে।

আর মহামতি লেলিন বলেছেন ‘শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, বিপ্লব আনে মুক্তি।’ কবি থেকে দার্শনিক সকলের কণ্ঠেই যুগে যুগে শোনা গিয়েছে চেতনার জয়গান। চেতনার বিকাশই মানবজীবনের উত্তরণ ঘটায়। আধ্যাত্মিক জীবনেও। তাই তো মাতৃসাধক গেয়েছিলেন, ‘আমার চেতনা চৈতন্য করে দে মা চৈতন্যময়ী।’ করোনার সঙ্কটমুক্তিও লুকিয়ে আছে সেই চেতনাতেই। ভ্যাকসিন এখনও আসেনি। এই অবস্থায় মানব-চেতনাই এনে দিতে পারে মহামারী বিরোধী লড়াইয়ে সাফল্য। কিন্তু সেই চেতনার অভাবেই আমরা দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছি সঙ্কট-সমুদ্রের অতলে।

প্রথম প্রথম সরকার ঘোষিত লকডাউনে ব্যাপক সাড়া মিলেছিল সারাদেশে। কারণ লাঠি নিয়ে পুলিস ছিল রাস্তায়। লাঠির অপার মহিমা। ‘লাঠি’ সিনেমায় ভিক্টর ব্যানার্জি দেখিয়েছিলেন, লাঠির তাকত। সার্কাসেও দেখা যেত লাঠির দাপট। লাঠির ভয়েই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারও হাতজোড় করত। বেয়াদপদের শায়েস্তা করতে সেই লাঠিই ভরসা। কিন্তু না ! সেই লাঠিও এখন লাটে উঠেছে।

সরকার বা প্রশাসনকে কাঠগড়ায় তুলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা যায়। কিন্তু করোনার মোকাবিলা করা যায় না। তার জন্য দরকার পরিকল্পনা এবং মানুষের চেতনা। শুধু সরকারের নয়, সমস্ত রাজনৈতিক দলেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। অধিকাংশ মানুষই কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী অথবা সমর্থক। তাই নেতারা যেভাবে ঘটনার ব্যাখ্যা করবেন, তাঁদের অনুগামীরা সেই চোখেই তা দেখবেন। বিরোধীরা সরকারের সমালোচনা করবে, এটাই স্বাভাবিক। যুগে যুগে সেটাই হয়ে এসেছে। কিন্তু, করোনা পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। সমালোচনার পাশাপাশি সদর্থক ভূমিকাও দরকার। তবেই কোভিড মোকাবিলা সহজ হবে। সরকারকে কাঠগড়ায় তুললেই বদলে যাবে না পরিস্থিতি। বদলানোর জন্য বদল দরকার। আমাদের ভাবনার। সব দলেরই রয়েছে যুব সংগঠন। অফুরন্ত শক্তির ভাণ্ডার। করোনা মোকাবিলায় দলগুলি কাজে লাগাক তাদের যুবশক্তিকে। করোনায় আক্রান্ত ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করা হোক। যৌবনের অন্তরে উদ্ভাসিত হোক বিবেকানন্দের বাণী, জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর

ভাবনা বদলালেই, বদলে যাবে পরিস্থিতি। যারা এই কাজ করতে পারবে তারাই জয় করে নেবে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়। তাহলে আর সমাজসেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইতে হবে না। উল্টে মানুষই তাদের খুঁজে নেবে। সমাজসেবা করার এটাই তো আসল সময়!






Related News

Comments are Closed