Main Menu

বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের জন্মশতবর্ষ উদযাপন : সিলেটে হবে দু’টি অনুষ্ঠান

ডেইলি বিডি নিউজঃ কালজয়ী গান ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান/মিলিয়া বাউলা গান আর মুরশিদি গাইতাম’, ‘বসন্ত বাতাসে সই’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘আমি কূলহারা কলঙ্কিন ‘, ‘কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া’ ‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু’ এমন হাজারো হৃদয়স্পর্শী জনপ্রিয় বাউল গান ও গণসংগীতের রচয়িতা একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম।

এ বছর বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের শতবর্ষ পূর্ণ হবে। বাউল সাধকের জন্মশতবর্ষ উদ্ যাপন নিয়ে সিলেটে হবে দুটি অনুষ্ঠান। ফলে বাউলপ্রেমীরা হচ্ছেন বিভ্রান্ত। এ নিয়ে সিলেটের সচেতন মহলে দেখা দিয়েছে মিশ্রপ্রতিক্রয়া। তারা বলছেন- দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক বিবর্তন শাহ আবদুল করিমের গানে যেমন স্পষ্টতা পেয়েছে, তেমনি লালন ও পালন পরবর্তী সময়ের বাউল দর্শনের অন্যতম ধারক ও সাধক তিনি। তাঁর সংগ্রামের হাতিয়ার ‘গান’। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, ভণ্ড রাজনীতির বিরুদ্ধে, ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে, অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তিনি তাঁর এই হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন।

ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম ভালাবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। এখন তাঁর সৃষ্টি দেশ ও সময়ের সীমা অতিক্রম করে পেয়েছে বিশ্বজনীন প্রীতি। হয়েছে কালোত্তীর্ণ। বাউল সাধক শাহ আবদুল করিম দেশের সম্পদ।

বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বছর ব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি। তাদের দাবি এ বাউল সাধক তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে বলেছেন, ‘মা বলেছেন জন্ম আমার ফাল্গুন মাসের প্রথম মঙ্গলবার’। সে অনুযায়ী তাঁর জন্মদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি।

গত শনিবার সকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করে কমিটির আহ্বায়ক ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ উৎসব। এর পরের দিন ১৭ থেকে ১৯ ফেব্রয়ারি পর্যন্ত সিলেটে অনুষ্ঠিত প্রথম উৎসব। শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সভাপতি করে ১০২ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে থাকছেন আরও দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও দেশের বিশিষ্টজনেরা।

কমিটিতে উপদেষ্টা হিসেবে আছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ও সংগীতজ্ঞ সুজেয় শ্যাম।

ঢাকাসহ বিভিনড়ব এলাকায় এ উৎসব হবে। শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষের শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। সাধকের মহাবাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দেশের বাইরের বিভিনড়ব স্থানেও উৎসবের আয়োজন করা হবে। প্রাথমিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও কলকাতা, আসামের শিলচর ও করিমগঞ্জে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় বড় ধরনের সমাপনী উৎসবের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালা।

অপরদিকে, সিলেটে ১৫ ফেব্রুয়ারি শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উৎসব উদ্যাপিত হবে বলে গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নগরের বারুতখানা এলাকায় এক প্রস্তুতিসভা শেষে আয়োজকেরা এসব তথ্য জানান। তাদের দাবি ১৫ ফেব্রুয়ারি শাহ আবদুল করিমের জন্মদিন, অনেকদিন গবেষণা করে তিনি জীবিত থাকতেই ঠিকঠাক করা হয়েছে। তাছাড়া তাকে নিয়ে যতবই লেখা হয়েছে সবটাতেই ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মদিন।

শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন পর্ষদের উদ্যোগে ও প্রথম আলোর সহ যোগিতায় নগরের রিকাবীবাজার এলাকার কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে বেলা চারটায় এ অনুষ্ঠান শুরু হবে। জাতীয়ভাবে ঘোষিত অনুষ্ঠানের পূর্বে আরেকটি অনুষ্ঠান শিল্প-সংস্কৃতিমনা মানুষের মাঝে প্রশেড়বর জন্ম দিয়েছে, কেন বাউল করিমকে নিয়ে একই শহরে দু’টো অনুষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সুধীজনেরা জানান, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন- বাউল সাধক শাহ আবদুল করিম দেশের গৌরব। তাঁর জীবন ও কর্ম তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌছানো আমাদের দায়িত্ব। এটা রাজনীতি নয় যে, পক্ষে-বিপক্ষে পালন করতে হবে।

বিশ্বের যে অঞ্চলে বাঙ্গালী আছে, সেখানেই শাহ আবদুল করিমের গান হচ্ছে উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন- বাউল সাধক শাহ আবদুল করিম আমাদের সার্বজনীন সম্পদ। কাজে এই পক্ষ সৃষ্টি না করে, সবাই এক হয়ে তাঁর গান ও কর্মকে সঠিকভাবে আমাদের মাঝে লালন করা প্রয়োজন।

জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান আহমদ বলেনসবার উদ্দেশ্যইতো শাহ আবদুল করিমের গান ও কথাকে প্রচার-প্রসার করে সঠিকভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌছানো। যেহেতু উদ্দেশ্য এক তাহলে পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি না করাই ভাল।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেটের সাধারণ সম্পাদক ও শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদ্ যাপন জাতীয় কমিটি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামছুল আলম সেলিম বলেন- শাহ আবদুল করিমের জন্মশতবর্ষ যে কেউ যেকোন ভাবে পালন করতে পারে। এ বাউল সাধক তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে বলেছেন, ‘মা বলেছেন জন্ম আমার ফাল্গুন মাসের প্রথম মঙ্গলবার’। সে অনুযায়ী তাঁর জন্মদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি। তাই শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি এদিনই পালন করছে।

সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত বলেনবাউল শাহ আবদুল করিম জীবিত থাকা অবস্থায় ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মদিন পালন করা হয়েছে। যদি ভূল হত তাহলে তিনি বলতেন, কাজেই এটা নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

প্রস্তুতিসভায় জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন পর্ষদের আহবায়ক কবি শুভেন্দু ইমাম জানান, উৎসবে বাংলাদেশ ও ভারতের খ্যাতনামা গবেষক ও শিল্পীরা উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া প্রয়াত বাউলের মূল ঘরনার শিষ্যরা সংগীত পরিবেশন করবেন। আলোচনা সভা, নৃত্য ও সংগীতানুষ্ঠানসহ বিভিনড়ব পরিবেশনার মাধ্যমে বাউলকে স্মরণ করা হবে। উৎসব উপলক্ষে একটি সুদৃশ্য স্মারকও প্রকাশিত হবে।

শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদ্ যাপন জাতীয় কমিটি সিলেটের আহবায়ক ও মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন- শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে যত বেশী প্রচার হবে তত ভাল। শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উৎসব জাতীয় ভাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে উদযাপিত হবে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এছাড়াও কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি স্ব উদ্যোগে উদযাপন করে সেটাও ভাল।

জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন পর্ষদের আহবায়ক কবি শুভেন্দু ইমাম বলেন- বিভ্রান্তির কিছু নেই, এটা সবাই করতে পারে। আসলে শাহ আবদুল করিমের জন্ম তারিখ হলো ১৫ ফেব্রুয়ারি। শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটি ১৬ ফেব্রুয়ারি বলে একটা মিথ্যা প্রচার করছে। অনেকদিন গবেষণা করে তিনি জীবিত থাকতেই ঠিকঠাক করা হয়েছে। তাছাড়া তাকে নিয়ে যতবই লেখা হয়েছে সবটাতেই ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মদিন।

সিলেট জেলা শিশু একাডেমীর জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা অসিত বরণ দাশ গুপ্ত বলেন- যত বেশী শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে চর্চা হবে অনুষ্ঠান হবে।

শুধুমাত্র সিলেটেই না গোটা বাংলাদেশে হবে। ভারতেরও কয়েকটা জায়গায় জন্মশতবর্ষ উৎসব উদ্যাপন হবে। আমাদের সিলেটেও দুটি পর্ষদ শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উৎসব উদ্যাপন করছে, একটি তিনদিন অপরটি একদিন। সেটা নিঃসন্দেহে ভাল।

একপ্রশেড়বর জবাবে তিনি বলেন- তারিখ বিষয় নয়, উপলক্ষ্য হচ্ছে মূখ্য বিষয়। পক্ষে-বিপক্ষে কোন বিষয় আমার কাছে মনে হয় না।






Related News

Comments are Closed