Main Menu

নিরাপত্তাহীনতায় ব্যাংক গ্রাহকরা

ডেইলি বিডি নিউজঃ সম্প্রতি তিন ব্যাংকের ছয়টি এটিএম বুথ থেকে ২০ লাখ টাকার ওপরে চুরির ঘটনায় দেশে সাড়া পড়ে যায়।

এরপর প্রীত রেজা নামের এক গ্রাহকের ব্র্যাক ব্যাংকের ডেবিট কার্ড জালিয়াতি করে তার কাছে কার্ড থাকা অবস্থায় একটি দোকানে তার কার্ডের নামে ২৫ হাজার টাকার কেনাকাটা হয়ে গেছে।

প্রীত রেজা বলেন, ‘আমি প্রথমে মনে করেছিলাম যে, আমার ব্র্যাক ব্যাংকের ডেবিট কার্ডটা হয়তো হারিয়ে ফেলেছি এবং কেউ সেটা ব্যবহার করে কেনাকাটা করেছে। কিন্তু খুঁজতেই দেখি কার্ড আমার মানি ব্যাগে। তখন আমি বুঝতে পারি, এটা জালিয়াতি।’

তিনি বলেন, ‘আমি ব্র্যাক ব্যাংকের বনানী এটিএম বুথে আমার কার্ডটি ব্যবহার করে থাকি, এ ছাড়া স্বপ্ন, আড়ং অথবা আগোরায় আমার কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা করি। এর বাইরে এ কার্ড আমি কোথাও ব্যবহার করি না।’

এ ছাড়া রাজধানীর মান্ডায় দেলোয়ার হোসেন নামে আরেক গ্রাহকের কেয়ারটেকারের মাধ্যমে টাকা ওঠানোর পর ছিনতাই করে ২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা।

দেলোয়ার বলেন, ‘আমি এই কেয়ারটেকারকে দিয়ে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠিয়েছি। আগে কখনো এই ধরনের সমস্যা হয়নি। আমার কেয়ারটেকারকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে কুড়িল বিশ্বরোড নিয়ে যায়। পরে টাকা রেখে সেখানে তাকে ফেলে দিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।’

এসব ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টির পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ব্যাংক গ্রাহকরা।

উত্তরা ব্যাংকের পল্টন শাখায় এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা ওঠাতে পারছেন না বলে ওই শাখায় সমস্যার সমাধান করতে এসেছেন আলী আহমাদ নামের এক গ্রাহক। তিনি বলেন, ‘যেভাবে কার্ড জালিয়াতি করে টাকা চুরির ঘটনা ঘটছে তাতে এখন এটিএম কার্ড ব্যবহার করাই ছেড়ে দিতে হবে। এটিএম কার্ড ব্যবহার করে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়, কোন সময় কী ঘটে যায়।’

গ্রাহক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সবকিছু যখন ম্যানুয়ালে চলছিল তখনো চুরির ঘটনা ঘটেছে, এখন ডিজিটাল হয়েছে, ফলে চুরির গতি পরিবর্তন হয়ে ইলেকট্রনিক্স চুরির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় নতুন করে ব্যাংক গ্রাহকের মধ্যে আস্থাহীনতার পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা।

এদিকে তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তিন ব্যাংকের ছয়টি এটিএম বুথ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা চুরি করেছে দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসম্পন্ন ও ঝুঁকি প্রতিরোধী ব্যবস্থাসম্পন্ন হার্ডওয়্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কার্ডই জালিয়াতির হুমকিতে পড়তে পারে। জালিয়াতি প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকের এটিএমে ব্যবহার করা হয় অ্যান্টি-স্কিমিং প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে এটিএমের তথ্য কপি করার সুযোগ কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে অ্যান্টি-স্কিমিং প্রযুক্তিসংবলিত এটিএমের দাম সাধারণ মানের এটিএমগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি। এ কারণে ব্যাংকগুলো এ ধরনের এটিএম ব্যবহারে খুব বেশি আগ্রহী নয় বলে জানা গেছে। ব্র্যান্ডভেদে সাধারণ মানের বিভিন্ন এটিএমের দাম যেখানে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা, সেখানে অ্যান্টি-স্কিমিং প্রযুক্তিসংবলিত এটিএমের দাম পড়ে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা।

সাম্প্রতিক জালিয়াতির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে যেসব জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে, তাতে মূলত এটিএম ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জড়িত। এ জালিয়াতি ও প্রতারণা বন্ধে ব্যাংকগুলোর আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ, ব্যাংকের কর্মকর্তার যোগসাজশ ব্যতীত কেউ ব্যাংকের টাকা চুরি করতে পারবে না।

এটিএমের মাধ্যমে লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে অ্যান্টি-স্কিমিং ছাড়াও বেশ কিছু প্রযুক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু হয়েছে। টু-ফ্যাক্টর ও বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন পদ্ধতি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবস্থায় প্রচলিত পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি গ্রাহকের সেলফোনের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। আর বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিকগনিশন প্রযুক্তি। এ ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত হলেই কেবল এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলন সম্ভব হয়। দেশের শীর্ষ এটিএম ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান আইটি কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আইটিসিএল) বলছে, ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়মিত পুরো ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা প্রয়োজন। এ ছাড়া কোনো কর্মী ব্যাংক ছেড়ে গেলে অ্যাকাউন্ট লক, পাসওয়ার্ড পরিবর্তনসহ সিকিউরিটি প্রটোকলের বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, ব্যাংকের দুর্বলতার কারণেই এই ঘটনাগুলো ঘটছে। ফলে তারা দায় এড়াতে পারে না। তাদের দুর্বলতার জন্য সাধারণ গ্রাহক কেনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিলে ব্যাংকের প্রতি সাধারণ গ্রাহকের আস্থা হারাতে শুরু করবে।’ এ ছাড়া যত্রতত্র এটিএম বুথ স্থাপনের বিরোধিতা করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও এত এটিএম বুথ আমি দেখিনি। এত বুথের কী প্রয়োজন। বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংকে গিয়ে তুলবে গ্রাহক, এই জন্য তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রাস্তার মোড়ে, যেখানে সেখানে অনিরাপদ স্থানে বুথ স্থাপন করা হয়েছে, এগুলো সংযত করা দরকার। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আইটি অফিস এবং তদারকি আরো বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সিকিউরিটি গার্ডদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সিসি ক্যামেরাগুলো সার্বক্ষণিক মনিটরিং দরকার।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘এত দিন ব্যাংকের ফিজিক্যাল সিকিউরিটি ভেঙে টাকা চুরি বা ডাকাতি হয়েছে। এরপর লজিক্যাল সিকিউরিটিও ভাঙতে পারে। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও এ ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।’

নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘এটিএম বুথে নিরাপত্তাসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাগুলো যথাসময়ে পালন করলে নিরাপত্তা বাড়বে।’ একই সঙ্গে জালিয়াতি রোধে গ্রাহকের সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ইবিএল তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিও ফুটেজ দেখলে হয়তো ক্ষতি কম হতো বা চোরদের ধরা যেত। তবে ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে। এর থেকেও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত। বর্তমানে ডিজিটালাইজডের অনেক সুবিধার পাশাপাশি কিছু সমস্যা থাকবেই। এই জন্য আমাদের ডিজিটাল সেবা থেকে দূরে সরে গেলে হবে না। আমাদের আরো বেশি সচেতন গ্রাহক প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়, আগে ম্যানুয়ালি চুরি হতো এখন হচ্ছে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের মাধ্যমে চুরি।’

 






Related News

Comments are Closed