Main Menu

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে থমকে আছে সড়ক সরানোর উদ্যোগ, মারা পড়ছে বন্যপ্রাণী

ডেইলি বিডি নিউজঃ বহু বিলুপ্তপ্রায় ও বিপন্ন প্রাণীর আধার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। প্রাণীদের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষায় এ বনের ভেতর থেকে রেল ও সড়কপথ সরানোর উদ্যোগ দুই বছর ধরে থমকে আছে। সড়ক সরাতে ২০১৯ সালের জুনে বন বিভাগ এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের যৌথ জরিপের পর আর কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। ফলে নিয়মিতই গাড়িচাপা পড়ে মারা পড়ছে বন্যপ্রাণী। গত মাসেও একটি বিরল প্রজাতির মুখপোড়া হনুমান মারা যায়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর থেকে রেল ও সড়কপথ সরানোর ব্যাপারে আলোচনা চলছে বহুদিন ধরেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সড়কগুলো স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৯ সালে সড়ক সরাতে যৌথ জরিপ হয়।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে ঢাকা-সিলেট রেলপথের পাঁচ কিলোমিটার আর শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের সাড়ে ছয় কিলোমিটার অংশ রয়েছে।

সড়ক সরানোর উদ্যোগের হালনাগাদ জানতে চাইলে সওজ বিভাগ মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, এ উদ্যোগের এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি নেই। জরিপের পর বিকল্প সড়কের জন্য একটি নকশা তৈরির জন্য ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

২০১৯ সালের জরিপকাজে অংশ নিয়েছিলেন বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তত্কালীন সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. আনিসুর রহমান। সম্প্রতি তিনি মৌলভীবাজার থেকে বদলি হয়ে গেছেন। আনিসুর রহমান বলেন, জরিপে দেখা গিয়েছিল শ্রীমঙ্গলের রাধানগর থেকে কমলগঞ্জের বটতলা পর্যন্ত বিকল্প সড়ক নির্মাণ সম্ভব। এতে সড়কটি পুরো লাউয়াছড়া বনের বাইরে চলে আসবে। তবে জরিপের পর এ উদ্যোগ আর তেমন এগোয়নি।

বন বিভাগের হিসাবে, লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী গাড়ির চাপায় প্রতি বছর গড়ে ৫০টি প্রাণী মারা যায়।

তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের হিসাব মতে, লাউয়াছড়ায় শুধু সড়কপথেই গাড়ির চাপায় প্রতি বছর মারা যায় প্রায় ৪৫টি বন্যপ্রাণী। আর রেলপথে প্রাণহানি ঘটে ৪০টির মতো।

মূলত পরিবেশবাদীদের দাবির মুখেই ২০১৫ সালে লাউয়াছড়ার ভেতর থেকে সড়ক ও রেলপথ সরানোর একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বন বিভাগ।

২০১৬ সালের ২ আগস্ট ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং রাতারগুল জলার বন’ সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় লাউয়াছড়া উদ্যানের প্রাণী রক্ষায় বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়ক সরিয়ে বিকল্প সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। বনের ভেতর থেকে কালাছড়া ও চাউতলি খাসিয়াপুঞ্জি সরিয়ে নেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, চা বাগান কর্তৃপক্ষ ও বন বিভাগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিকল্প সড়ক বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল ওই সভায়।

এ সিদ্ধান্তের তিন বছর পর বিকল্প সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে যৌথ জরিপ করে বন বিভাগ ও সওজ। শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের বিকল্প হিসেবে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বাইরে দিয়ে যেসব সড়ক গেছে, সেই সড়কের ওপর প্রাথমিক জরিপ চালানো হয়। জরিপে বিকল্প সড়ক নির্মাণে ঐকমত্যে পৌঁছে দুই বিভাগ।

জরিপ শেষে দুই বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, বিকল্প সড়কের দূরত্ব ৮ থেকে ১০ কিলোমিটারের মতো হতে পারে। এটি বাস্তবায়ন হলে উদ্যানের ভেতরের সড়ক বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি উদ্যান এলাকা থেকে নূরজাহান চা-বাগান হয়ে চলে যাওয়া সড়কটিও বন্ধ করা হবে। কিন্তু জরিপকাজ শেষের দুই বছর পরও এ উদ্যোগের অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু বলতে পারছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো।

বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেলপথ ও সড়কপথকে বন্যপ্রাণীর জন্য মরণফাঁদ বলে মনে করেন লাউয়াছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক জলি পাল। তিনি বলেন, ব্রিটিশরা মূলত সহজে বনের গাছ পাচারের জন্য সংরক্ষিত এসব বনের ভেতর দিয়ে রেল ও সড়ক যোগাযোগ তৈরি করেছিল। সেটি বন্যপ্রাণীদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। পথগুলো স্থানান্তর করা না গেলে কোনোভাবেই বন্যপ্রাণী রক্ষা করা যাবে না।

এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জরিপের পর সড়ক সরানোর কাজ মূলত সওজ বিভাগের। তারা এ ব্যাপারে কাজ করছে বলে শুনেছি। তবে অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু জানি না।

তিনি বলেন, লাউয়াছড়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রাণী মারা যায় রাতে। কারণ তখন যানবাহন দ্রুতগতিতে চলে এবং আমাদের পাহারাও শিথিল থাকে। ফলে কোনো প্রাণী আহত হলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় না। লাউয়াছড়ার প্রাণীদের রক্ষায় বিকল্প সড়ক হওয়াটা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

১২৫০ হেক্টর জমি নিয়ে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ১৯৯৬ সালে এটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। বন বিভাগের হিসাবে এ বনে ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ (৩৯ প্রজাতির সাপ, ১৮ প্রজাতির লিজার্ড, ২ প্রজাতির কচ্ছপ), ২২ প্রজাতির উভচর, ২৪৬ প্রজাতির পাখি ও অসংখ্য কীটপতঙ্গ রয়েছে। এ বনে বিরল প্রজাতির উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমানও দেখতে পাওয়া যায়।






Related News

Comments are Closed