Main Menu

সুরমায় জেগেছে চর : বিকেলে বসে শিশুদের খেলার আসর

অজয় বৈদ্য অন্তরঃ দু’কুলে জেগেছে চর। চর পড়া জায়গায় বিকেল বেলা বসছে খেলার আসর। ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ের দল এখন নাইতে নয়, খেলার জন্য দলবেঁধে সুরমার বুকে আসে। খেলার জায়গা না থাকায় সুরমার দু’পাড় এখন বিকেল বেলা খেলার একমাত্র ভরসা।

নদী সুরমার সেই যৌবনা এখন নেই। নেই নদীপাড়ে নৌকা চলাচলের মনোরম সেই দৃশ্য। তেজ হারিয়ে স্রোতস্বীনী সুরমা এখন মরাখালে পরিণত হয়েছে। সোমবার বিকেল বেলা নগরীর চাঁদনীঘাট এলাকা ঘুরে এসে এমন দৃশ্যই দেখা গেল।

শুধু নগর কিংবা শহরতলীর আশপাশের এলাকাতেই নয়, পলি জমে একাধিক চর জেগেছে সুরমার উৎসমুখেও। দুইপাশে জেগে ওঠা চরের মাঝখান দিয়ে বইছে সরু পানির ধারা। দেখলে মনে হবে এ যেন নদী নয়, মরা খাল। আবার কোথাও পায়ে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন মানুষ।

একই অবস্থা কুশিয়ারা নদীরও। একসময় আগেও এ নদী দুটি উত্তাল থাকলেও এখন খরস্রোতা সুরমা ও কুশিয়ারার দুই ধারে ধু-ধু বালুচর। এই দুই নদীর একেক জায়গায় একেক রূপ। সুরমা নদীর কোথাও দূষণ, কোথাও ভাঙন আবার কোথায় ধু-ধু বালুচর। ভাঙনে কুশিয়ারার গর্ভে বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ বিলীন হচ্ছে ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাড়ছে বসত ঘর, ভিটেমাটি হারানো মানুষের সংখ্যা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সিলেট নগরী ও সদর উপজেলার কালিঘাট, মাছিমপুর, ঝালোপাড়া, আখালিয়া ঘাট, কুশিঘাট, মুক্তিরচক, কানিশাইল ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই এলাকায় সুরমার বুক চিরে বিশাল বিশাল চর জেগেছে। নগরীর কাজিরবাজার থেকে দক্ষিণ সুরমার শ্রীরামপুর পর্যন্ত এই এলাকাজুড়ে সুরমার বুকে জেগেছে দীর্ঘ চর। সেখানে খেলাধুলা করছে শিশু-কিশোর ও যুবকেরা। এছাড়া চরের ওপর গজিয়েছে ঘাস। কেউবা চরে বিভিন্ন প্রজাতির সবজি চাষ করছেন। হঠাৎ দেখে মনে হতে পারে কোন পতিত জমি। এসব এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা প্রায় পুরোটাই শুকিয়ে গেছে। পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে নদীর বুক। জেগে ওঠেছে বড় বড় চর। প্রয়োজনে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন লোকজন। শুস্ক মৌসুমে ধারাবাহিকভাবে নদীতে পানি কমছে। আর পানির অভাবে কৃষক ও মৎস্যজীবীরা পড়েছেন বিপাকে। নাব্যতা সংকটে পণ্যবাহী নৌযান চলতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যও।

জানা যায়, সুরমা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪৯ কিলোমিটার। ভারতের করিমগঞ্জের পাহাড়ি নদ বরাক সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জের অমলসিদে দুই ভাগ হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে সুরমা ও কুশিয়ার নামে। সুরমা নদী জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ, সিলেট সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ শহর হয়ে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে গিয়ে কুশিয়ারার সঙ্গে মিলিত হয়ে কালনি নাম নিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মাধ্যমেই মূলত সিলেট বিভাগের প্রায় ১০০টি নদ-নদীতে পানি প্রবাহিত হয়। বর্ষায় বন্যাপ্রবণ সুরমায় শীতে দেখা দেয় নাব্যতা সংকট।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি সূত্রে জানা গেছে, একসময় বরাক হয়ে আসা পানির ৬০ শতাংশ কুশিয়ারায় এবং বাকি ৪০ শতাংশ সুরমা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো। কিন্তু উৎসস্থল অমলসিদ থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত সুরমার যাত্রাপথে স্থানে স্থানে চর জেগে ওঠায় এখন ৮০ শতাংশ পানিই যাচ্ছে কুশিয়ারায়। অন্যদিকে ২০ শতাংশ পানি নিয়ে সুরমা ক্রমেই রূপ নিচ্ছে মরা নদীতে। সুরমা ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষকালে ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢল নামলে নদী উপচে নগরীসহ আশপাশের নিচু এলাকায় পানি ঢুকে যায়।

সুরমা নদীর উৎসমুখে অবস্থিত অমলসিদ গ্রামের বাসিন্দা বলেন, গত দুই দশক ধরে নদীর উৎসমুখে পলি জমে একটি টিলাসদৃশ চর তৈরি হয়েছে। চরটি কুশিয়ারা নদীর জন্য বাধা সৃষ্টি না করলেও সুরমা নদীতে যথাযথভাবে পানি প্রবাহিত হতে পারছে না। এজন্য শুষ্ক মৌসুমে পুরো নদী যেমন পানিশূন্য থাকে, তেমনি বর্ষাকালে অল্পবৃষ্টিতেই দেখা দেয় বন্যা। এই অবস্থায় খননেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। যদি দ্রুত নদী খনন না করলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, সুরমার নাব্যতা বাড়াতে ‘সুরমা রিভার রেস্টুরেশন প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্পের ধারণাপত্র ২০১৭ সালের জুন মাসে সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা দিয়েছিলো সিলেট পাউবো। ৫৩৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প অনুমোদিত হলে সুরমা নদীর ১৬০ কিলোমিটার খনন করার কথা। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন হয়নি। এর আগে ২০১২ সালে পাউবো সুরমা খননের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর নদী খননের সমীক্ষা চালানো হয়েছিলো। কিন্তু পরে আর অগ্রগতি হয়নি।

পাউবোর একটি সূত্রে জানা যায়, সুরমা নদী প্রথম ২৫ কিলোমিটার সীমান্ত লাইন দিয়ে গেছে। ফলে উৎসমুখ খননের জন্য যৌথ নদী কমিশন থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু সেটি সম্ভব না হওয়ায় খনন প্রক্রিয়াও থেমে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুরমা নদীর সিলেট অংশের ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত অর্ধশতাধিক স্থানে চর জেগেছে। শুধু জকিগঞ্জের আমলসীদ থেকে লোভাছড়ার সংযোগস্থল পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটারে চর জেগেছে ৩৫টি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুজ্জামান সরকার বলেন, সুরমার বিভিন্ন পয়েন্টে খনন প্রয়োজন। বিশেষত: শুস্ক মৌসুমে সুরমায় পানি না থাকার মূলে উৎসমুখ বরাক মোহনা ভরাট হয়ে যায়। উৎপত্তিস্থল ভরাট হওয়াতে এ মৌসুমে ৩০ শতাংশ পানিও আসে না সুরমায়। তিনি আরো বলেন, সুরমা খননের কোনো বরাদ্দ আসেনি। তবে নদী তীর রক্ষায় এক কোটি ২০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প সময়মতো কাজ না হওয়ায় ফেরত গেছে।






Related News

Comments are Closed